হাসিবুর রশীদ | লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোর | একসময় জমিদারি ঐশ্বর্য, সামাজিক প্রভাব ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের প্রতীক ছিল কামানখোলা জমিদার বাড়ি। আজ সময়ের নির্মম আঘাতে সেই প্রাসাদ দাঁড়িয়ে আছে ভাঙা দেয়াল, ঝরে পড়া ইট আর সুনসান নীরবতা নিয়ে—যেন প্রতিটি কোণ ফিসফিস করে বলছে, “আমাকে ভুলে যেয়ো না।”
লক্ষ্মীপুর জেলার সদর উপজেলার দালালবাজার থেকে প্রায় দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূরে এক নিভৃত গ্রামে অবস্থিত প্রায় দুই শতাব্দী প্রাচীন এই জমিদার বাড়িটি এখন চরম অবহেলা ও সংস্কারহীনতায় ধ্বংসের মুখে।
ইতিহাসের আলোকিত অধ্যায়
স্থানীয় ইতিহাস ও পারিবারিক সূত্র অনুযায়ী, কামানখোলা জমিদার বাড়ির গোড়াপত্তন করেন এই অঞ্চলের প্রভাবশালী জমিদার রাজেন্দ্র নাথ দাস। তাঁর সময়েই প্রাসাদটি প্রথম পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। পরবর্তীতে জমিদারির দায়িত্ব সামলান তাঁর পুত্র ক্ষেত্রনাথ দাস এবং পৌত্র যদুনাথ দাস। জমিদার বাড়িটির শেষ দিকের উত্তরসূরি ছিলেন দত্তক পুত্র হরেন্দ্র নারায়ণ দাস চৌধুরী—স্থানীয়দের কাছে যিনি ‘হরেন্দ্র বাবু’ নামে পরিচিত। তাঁর সময়কালেই জমিদারি ব্যবস্থার অবসান ঘটে বলে ধারণা করা হয়।
ঐতিহ্য, উৎসব আর বিচারকেন্দ্র
একসময় চারদিকে বিস্তৃত খোলা প্রাঙ্গণ আর মাঝখানে বিশাল অন্দরমহল নিয়ে জমজমাট ছিল এই প্রাসাদ। এই উঠোনেই অনুষ্ঠিত হতো দুর্গাপূজা, কীর্তন, নাট্যাভিনয় ও অতিথি আপ্যায়ন। বাইরের ফটকের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকত সশস্ত্র রক্ষী। ভেতরে ছিল অতিথিশালা, কাচঘর, পূজামণ্ডপ ও জমিদারের ব্যক্তিগত প্রার্থনালয়।
লোককথায় জানা যায়, যদুনাথ দাস ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু ও ন্যায়পরায়ণ জমিদার। আশপাশের গ্রামের মানুষ অভাব-অভিযোগ নিয়ে এলে তিনি নিজ উঠোনে বসেই বিচার করতেন। পূর্ণিমার রাতে মোমবাতির আলোয় পালকি এসে থামত বাড়ির সামনে, দূরদূরান্ত থেকে অতিথিরা আসত। তখন কামানখোলা জমিদার বাড়ি ছিল সামাজিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু।
পতনের গল্প
সময় বদলেছে। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় সংঘর্ষ, অস্থিরতা ও মালিকানা-বিবাদ। ধীরে ধীরে জনমানবশূন্য হয়ে পড়ে এই ঐতিহাসিক প্রাসাদ। যে বাড়ি একসময় আলো ও কোলাহলে ভরা ছিল, সেখানে এখন রাজত্ব করছে নিস্তব্ধতা।
শ্যাওলা ধরা দেয়াল, গাছের শেকড়ে আঁকড়ে থাকা ইট, ভাঙা জানালার কাঠ আর শূন্য দরজার খোপ—সব মিলিয়ে যেন অতীতের ক্ষতচিহ্ন বহন করছে ভবনটি। তবুও চৌকো আঙিনায় পড়ে থাকা আলো দেখে মনে হয়, এইমাত্র জমিদার হেঁটে গেলেন, পেছনে রক্ষীরা, চারপাশে ব্যস্ততার ছাপ।
সংরক্ষণের দাবি
সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে পড়ছে কামানখোলা জমিদার বাড়ির প্রতিটি অংশ। অথচ সামান্য যত্ন আর উদ্যোগ নিলে এটি হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র। এখানে সংরক্ষিত হতে পারে জমিদারি জীবনের জানা-অজানা ইতিহাস, স্থাপত্য আর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
একসময় সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পর্যটকদের পদচারণা থাকলেও বর্তমানে সেই আগ্রহ প্রায় শূন্যের কোঠায়। ইতিহাসপ্রেমী ও সংস্কৃতিবান মানুষের চোখে এই অবহেলিত প্রাসাদ এখন কেবলই এক নীরব আর্তনাদ—সংরক্ষণের অপেক্ষায়।



0Share