নিজস্ব প্রতিবেদক, লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোর | মেঘনার উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুর। কৃষি ও মৎস্য সম্পদের জন্য এ জেলা সারাদেশে সুপরিচিত। কৃষি, মৎস্য সম্পদের পাশাপাশি এ জেলাবাসীর আয়ের প্রধান উৎস প্রবাসের কর্মসংস্থান। স্বাধীনতার পর থেকে শত চেষ্টা করেও জেলাবাসী উন্নত সড়ক অবকাঠামো, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, উচ্চ শিক্ষা এবং স্থানীয় ভাবে কলকারখানা স্থাপন করে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেনি।
এর মাঝে রাজনৈতিক সন্ত্রাস কবলিত জনপদ হিসেবে লক্ষ্মীপুর সারাদেশে পরিচিতি পেয়েছে। এখন জেলার এমন কোন গ্রাম নেই যেখানে হাত বাড়ালেই মাদক মিলছে না।
তাই ভোটাররা সবসময়ই চায় যোগ্য ও জনবান্ধব জনপ্রতিনিধি, যারা নির্বাচিত হলে দূর করতে পারবে মাদক ও সন্ত্রাস এবং উন্নয়ন আসবে জনপদে। কিন্ত সে জনপ্রতিনিধি এখনো পাওয়া যায়নি। তাই ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে এখন সবার প্রত্যাশা।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে কতজন ?
লক্ষ্মীপুর জেলার চার আসনে ২৯ জন প্রার্থী প্রতীক বরাদ্দ পেলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মাত্র ১৩জন বাকি ১৬জনকে প্রচারে দেখা যায়নি। এদের মধ্যে বিএনপি, জামায়াত, জেএসডি, ইসলামী আন্দোলন ও এনসিপির ১১ জন প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে কোন কোন প্রতীকে ?
রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচন তুলনামূলকভাবে কঠিন। প্রতিটি আসনে জামায়াতের ভোট ও শক্তি বেড়েছে প্রায় দ্বিগুন। তবুও অতীতের পরিসংখ্যান থেকে এখনো অনেকে মনে করছেন এবারও চারটি আসনেই বিএনপি জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি।
তবে চার আসনের মধ্যে লক্ষ্মীপুর-১ আসনে বিএনপি ও এনসিপি, লক্ষ্মীপুর-২ আসনে বিএনপি ও জামায়াত, লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে বিএনপি ও জামায়াত এবং রক্ষ্মীপুর-৪ আসনে বিএনপি, জামায়াত এবং জেএসডির মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।
এর মধ্যে লক্ষ্মীপুর-২ এবং লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে স্মরণকালের সবচেয়ে তীব্র।
আসনের বিবরণ:
লক্ষ্মীপুর জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা লক্ষ্মীপুর সদর আসন। জাতীয় সংসদে এর নাম লক্ষ্মীপুর-৩ এবং আসন নম্বর ২৭৬। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বাঙ্গাখাঁ ইউনিয়ন, লাহারকান্দি ইউনিয়ন, ভবানীগঞ্জ ইউনিয়ন, তেওয়ারীগঞ্জ ইউনিয়ন, দত্তপাড়া ইউনিয়ন, লক্ষ্মীপুর পৌরসভা, উত্তর জয়পুর ইউনিয়ন, চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়ন, হাজিরপাড়া ইউনিয়ন, চর শাহী ইউনিয়ন, দিঘলী ইউনিয়ন, মান্দারী ইউনিয়ন, কুশাখালী ইউনিয়ন নিয়ে লক্ষ্মীপুর-৩ আসনটি গঠিত।
আয়তন ও জনসংখ্যা:
সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন, একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত লক্ষ্মীপুর-৩ আসন। জনসংখ্যা ৫ লাখ ৫৫ হাজার । যার মধ্যে শিক্ষার হার প্রায় ৭৫.৪৬%। এখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি কিলোমিটারে ১৬শ ৯৬ জন।
মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা:
লক্ষ্মীপুর জেলা শহরটি এ আসনে অবস্থিত হলেও অন্যান্য আসনের তুলনায় এ আসনটি অনুন্নত। ধান, নারিকেল, সুপারি এবং বৈদেশিক রেমিটেন্সর ওপর ভিত্তি করে এখানকার অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। এলাকার বেশির ভাগ রাস্তাঘাট অনুন্নত। মাদক ও রাজনৈতিক সন্ত্রাস এখানকার তরুণদের জন্য প্রধান হুমকি। এখানকার হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক দারুণ।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটার ও কেন্দ্র
এ আসনের মোট ভোটার চার লাখ ৩৪ হাজার ৬শ ৫। এর মধ্যে দুই লাখ ২০ হাজার ৭শ ৩০ জন পুরুষ, দুই লাখ ১৪ হাজার ৭০ জন নারী । ভোট কেন্দ্র ১৩০টি।
বিগত নিরপেক্ষ নির্বাচনে রাজনৈতিক অবস্থান
বাংলাদেশে বিগত সময়ে যতগুলো নির্বাচন হয় তার মধ্যে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্ধিতা পূর্ণ নির্বাচন ছিল ৪টি। সে নির্বাচনগুলোতে বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামীলীগ এবং জাতীয় পার্টি অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে ১৯৯১ সালের নির্বাচন এবং নির্দলীয় সরকারের অধীন ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচন ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্ধিতা পূর্ণ নির্বাচন। এ নির্বাচনগুলো নিয়ে কারো দ্বিমত ছিল না। তাই বাংলাদেশের যে কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের সংখ্যা নির্ধারণে এখনো সেই নির্বাচনগুলোকেই ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়।
তবুও ২০১১ সালে সাবেক আওয়ামীলীগ সরকার নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। এরপর ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে যে নির্বাচন হয়, তা ছিল মূলত একদলীয় এবং কারচুপিপূর্ণ ও বির্তকিত ভোট।
অন্যদিকে ২০১৪ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ গ্রহন করেনি। কিন্ত বিএনপি অংশ গ্রহন করলেও ২০১৮ সালের নির্বাচনটি বির্তকিত ভোট হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পেলেও আওয়ামীলীগ দাবি করে তাদেরকে ৮০ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছে।
তাই প্রতিদ্বন্ধিতা বোঝার জন্য ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ৪টি নির্বাচনকে ভিত্তি ধরে তথ্য বিশ্লেষণ এবং আসন্ন ২০২৬ সালের নির্বাচনের মাঠ দেখে লক্ষ্মীপুর জেলার ৪টি সংসদীয় আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভোট ব্যাংক চিত্র তুলে ধরা হলো।
১৯৯১-২০০৮ সাল পর্যন্ত বিএনপির ভোট কত ছিল ?
১৯৯১ সাল : ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির এডভোকেট খায়রুল এনাম পায় ৩১.৬৫% ভোট।
১৯৯৬ সাল : ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির এডভোকেট খায়রুল এনাম পায় ৪৩.৭১% ভোট।
২০০১ সাল : ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি পায় ৬৮.০২% ভোট।
২০০৮ সাল : ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি পায় ৫৬.৪৫ % ভোট।
১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের এ ৪টি নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে বিএনপির প্রাপ্ত ভোটের গড় ছিল ৪৯.৯৬% ।
১৯৯১-২০০৮ সাল পর্যন্ত জামায়াতের ভোট কত ছিল ?
১৯৯১ সাল : দাড়িঁপাল্লা প্রতীকে জামায়াতের মোহাম্মদ সফিক উল্লাহ ২২.৫০ % ভোট।
১৯৯৬ সাল : দাড়িঁপাল্লা প্রতীকে জামায়াতের মোহাম্মদ সফিক উল্লাহ ১৬.৬৯ % ভোট।
২০০১ সাল : প্রার্থী ছিল না।
২০০৮ সাল : প্রার্থী ছিল না।
১৯৯১, ১৯৯৬ সালের এ ২ টি নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রাপ্ত ভোটের গড় ছিল ১৯.৬০% ।
১৯৯১-২০০৮ সাল পর্যন্ত আওয়ামীলীগের ভোট কত ছিল ?
১৯৯১ সাল:নৌকা প্রতীকে আওয়ামীলীগের একেএম শাহজাহান কামাল পায় ২২.৩৪% ভোট।
১৯৯৬ সাল: নৌকা প্রতীকে আওয়ামীলীগের একেএম শাহজাহান কামাল পায় ২৮.৭৬% ভোট।
২০০১ সাল: নৌকা প্রতীকে আওয়ামীলীগের কাজী ইকবাল পায় ২৯.৪৬% ভোট।
২০০৮ সাল: নৌকা প্রতীকে আওয়ামীলীগের আবুল হাসেম পায় ৪২.২৫% ভোট।
১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের এ ৪টি নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে আওয়ামীলীগের প্রাপ্ত ভোটের গড় ছিল ৩০.৭০%।
লক্ষ্মীপুর-১ আসনে ইসলামী আন্দোলনের ভোট কত ?
২০০৮ সাল: হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলনের মাহফুজুর রহমান পায় ০.৫৭% ভোট।
বিগত ৪টি নির্বাচনের তথ্যানুসারে জানা দেখা গেছে বিগত ৪টি নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির গড় ভোটের পরিমাণ ৪৯.৯৬%, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভোট ১৯.৬০%, আওয়ামীলীগের গড় ভোট৩০.৭০% এবং ইসলামী আন্দোলনের ০.৫৭% ভোট।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে কোন দলের অবস্থান কেমন?
তরুণ ও নারী ভোটার এবার নির্বাচনের বড় ফ্যাক্টর। এ অবস্থায় আসন্ন নির্বাচনী হিসাব-নিকাশ বেশ জটিল বলছেন, ভোটারেরা। এ আসনে ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির সাথে ঢাকা মহানগরীর উত্তর জামায়াতের সেক্রেটারী ড. রেজাউল করিমের সাথেই মূল লড়াই হচ্ছে। পূর্বে এ আসনে বিএনপি নেতা এ্যানি দুবার নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত এ আসনটি বিএনপির দখলে ছিল। আসন্ন নির্বাচনেও এগিয়ে রয়েছে বিএনপি।
তবে জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ রেজউল করিমও শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। উন্নয়ন বঞ্চিত এ আসনের ভোটারদের কাছে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নিয়ে হাজির হচ্ছে বড় এ দুটি দলের প্রার্থীরা।
তবে এ দুই প্রার্থীর কাছে ভোটারদের প্রত্যাশা, যিনিই নির্বাচিত হোক না কেন, তিনি যেন সদরের পূর্বাঞ্চলে সন্ত্রাস রোধে কঠোর হস্তে কাজ করেন। রাজনৈতিক মদতে দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকাগুলোতে লাগামহীন সন্ত্রাস, খুনোখুনি ও অস্ত্রবাজি চলছে। এ অবস্থায় সন্ত্রাসমুক্ত স্বাভাবিক পরিবেশ চান ভোটাররা।
তারা দুজন ছাড়াও অন্য প্রার্থীদের মধ্যে আছেন ইসলামী আন্দোলনের মো. ইব্রাহিম (হাতপাখা), জাতীয় পার্টির একেএম মহিউদ্দিন (লাঙ্গল), এলডিপির শামছুদ্দিন (ছাতা) ও এনপিপির সেলিম মাহামুদ।



0Share