সানা উল্লাহ সানুঃ বর্তমানে লক্ষ্মীপুরের রামগতি এবং কমলনগর কে মেঘনা নদীর ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য যে প্রকল্প চলছে তার প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা পুরুষের নাম মোঃ মাহবুবুর রহমান। পেশায় আয়কর আইনজীবি। স্থানীয়রা তাঁকে এডভোকেট মাহবুবুর রহমান নামেই জানে। নিভৃতচারী এ লোকটি বর্তমানে (২০১৮) বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ লক্ষ্মীপুর জেলা শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি। তাঁর স্বপ্ন ও ধ্যানজ্ঞান ছিল মেঘনার ভাঙ্গন ঠেকানো নিয়ে। জনাব মাহবুবুর রহমানের সাথে একান্ত সাক্ষাতকারে বিভিন্ন তথ্য দেখে জানা যায় মেঘনার ভাঙ্গনরোধের তাঁর স্বপ্নের কথা।
জনাব মোঃ মাহবুবুর রহমান জানান, তিনি ২০০৮ সালে লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসন থেকে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন ক্রয় করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাতের সময় তিনি নিজের নমিমেশনের বিনিময়ে রামগতি-কমলনগরের নদী ভাঙ্গনরোধ চেয়ে নমিনেশন প্রত্যাহার করে নেন। নির্বাচনে আওয়ামলীগ জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। কিন্তু তাঁর আসনে আওয়ামীলীগ জয়লাভ করেননি। তবুও জনাব মাহবুবুর রহমান রামগতি-কমলনগর কে মেঘনার ভাঙ্গন থেকে রক্ষার জন্য সরাসরি প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদন করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী জাহাঙ্গীর আলমসহ তখনকার সংরক্ষিত মহিলা সাংসদ ফরিদুন্নাহার লাইলী এবং সাবেক পানি সম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন তাকে এ কাজে বিশেষ সহযোগিতা করেন। তাঁর আবেদনের প্রেক্ষিতে (ইউও-১৩.৩৯.১৬.০০.০০.১০.২০০৯) ২০০৯ সালের ২৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেঘনার ভাঙ্গন থেকে রামগতি-কমলনগর রক্ষাকল্পে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রনালয়কে নির্দেশ দেন। এ আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১০ সালের ১৮ জুলাই ( স্মারক-৪-পি-২৫/চীফ প্ল্যানিং/১৫৩৬) পানি সম্পদ মন্ত্রনালয় ডিপিপি প্রনয়নের প্রয়োজনী ব্যবস্থা গ্রহন করে। এরপর ২০১১ সালের ১৬ আগষ্ট তিনি পূনরায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আবেদন করেন। পরে ২০১২ সালের ১৫ জানুয়ারি তারিখে এটি কে প্রকল্পটিভুক্ত করার জন্য বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড পানি সম্পদ মন্ত্রনালয় কে চুড়ান্ত অনুরোধ করে (পরি/১০১)। এর মধ্যে সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।
নাছোড়বান্দা জনাব মাহবুবুর রহমান শুধু নদী ভাঙ্গনরোধ করতেই ২০১৪ সালেও তিনি আবার আওয়ামীলীগের মনোনয়ন ক্রয় করেন। কিন্তু এ বছরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার এলাকার নদী ভাঙ্গনরোধে কাজ হবে এমন নিশ্চিত আশ্বাস দিলে তিনি আর নির্বাচনে অংশ নেয়নি। নির্বাচনে তার আসনে আওয়ামীলীগ জয়লাভ করে। ফলে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের চিন্তাটি গতি পায়। জনাব মোঃ মাহবুবুর রহমানের সাথে দীর্ঘ সাক্ষাতকারেে এবং এ সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখ তথ্যগুলো জানা যায়।
শেষ পর্যন্ত ২০১৪ সালের ৫ আগষ্ট জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা রামগতি ও কমলনগর উপজেলা এবং তৎসংলগ্ন এলাকাকে মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙ্গন হতে রক্ষাকল্পে নদীর তীর সংরক্ষণ (১ম পর্যায়)’ শীর্ষক ১শ ৯৮ কোটি ২ লক্ষ টাকার একটি প্রকল্প পাশ করে । যার শেষ সময় সীমা ২০১৯ সাল। ২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি রামগতি উপজেলা কমপ্লেক্সের সামনে নদী ভাঙারোধ প্রকল্পের কাজের উদ্ধোধন করেন বর্তমান সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল মামুন।
কিন্তু প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ে রামগতির আলেকজান্ডার এলাকার বাঁধটি উপযুক্ত হলেও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে কমলনগরের বাঁধ নিয়ে প্রকাশিত সংবাদে দেখে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন। ইতোমধ্যে তার নিজের এলাকা এখনো অরক্ষিত। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ সরকারের মেয়াদেই তার মতো লাখো মানুষের স্বপ্নটি বাস্তবায়িত হবে।
জনাব মোঃ মাহবুবুর রহমানের জন্ম ১৯৪৪ সালের ১৬ আগষ্ট লক্ষ্মীপুরের সদর উপজেলার কুশাখালী গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। তবে মেঘনা নদীল ভাঙ্গনের শিকার হয়ে ১৯৫১ সালে তাদের পুরো পরিবার সাবেক রামগতি (বর্তমানে কমলনগর) উপজেলার চর মার্টিন গ্রামে এসে নতুন বসতি স্থাপন করে । বাবা হাজী মৌলভী হেদায়েত উল্লাহ এবং মাতা নুরজাহান বেগম। তিনি ১৯৬৩ সালে লক্ষ্মীপুরের দালাল বাজার এনকে হাই স্কুল থেকে মেট্রিককুলেশন পাশ করেন। এরপর ১৯৬৫ সালে এইচএসসি এবং ১৯৬৮ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী নেন। ১৯৬৩ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়ার সময়ই তাঁর রাজনীতিতে হাতে খড়ি হয়। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয়হন। স্নাতক পাশের পরে তিনি রায়পুরের রাখালিয়া হাই স্কুলে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। এ বিদ্যালয়ে তিনি ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত চাকুরী করেন। ১৯৭৬ সালে তিনি ঢাকায় গিয়ে রেভিনিউ বোর্ডের সনদ নিয়ে আয়কর আইনজীবি হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে অদ্যাবধি সে পেশায় আছেন। ২ ছেলে এবং ২ মেয়ে সন্তানের জনক মাহবুবুর রহমান স্ত্রীসহ ২০১৭ সালে পবিত্র হজ পালন করেন। বড় ছেলে আবদুর রহমান দেশে ব্যবসা করে। আর ছোট ছেলে আতিকুর রহমান সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রী নিয়ে বর্তমানে কানাডায় এবং মেয়ে ফাতেমা থাকেন যুক্তরাজ্যে আছে। ছোট মেয়ে দেশে আছেন।
বাংলাদেশ নদী গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য থেকে জানা যায়, ১৯৩০ সাল পর্যন্ত মেঘনার বুকে নতুন চর জাগতে জাগতে মেঘনা চলে যায় লক্ষ্মীপুর থেকে প্রায় ১শ কিমি দক্ষিণে। কিন্তু এরপর থেকে আবার চলে নিয়মিত বা অনিয়মিত ভাঙন। ১৯৭০ সাল থেকে মেঘনার নিয়মিত ভাঙন যেন ভয়াবহ রুপ নেয়। অব্যাহত ভাঙনে সাবেক রামগতির বিস্তৃর্ণ এলাকা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ২০০৬ সালে কমলনগর উপজেলা গঠিত হয়। রামগতি এবং কমলনগরের ৮৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ৩৭ কিলোমিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে সম্পূর্ন ভাবে। এ দু উপজেলায় এখনো ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।

কিন্তু ভাঙন ঠেকাতে জনসাধারণের দাবি ও জনপ্রতিনিধিদের প্রচেষ্টা চলছে বহু বছর থেকে। স্থানীয় লোকজন ভাঙ্গনরোধের দাবি জানিয়ে দীর্ঘদিন ধরে হরতাল, অবরোধ, মানববন্ধন, সভা-সেমিনার, পদযাত্রা ও মসজিদসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে দোয়া ও প্রার্থনা করে আসছেন। কিন্তু ১৯৭১ সালের পর ২০০৮ সাল পর্যন্ত বড় কোন প্রদক্ষেপ এখানে চোখে পড়েনি। তবে ভাঙ্গন রোধের জন্য অনেক পূর্ব থেকে অফিসিয়াল বিভিন্ন চিঠিপত্র চালাচালি ছিল। শেষ পর্যন্ত জনাব মাহবুবুর রহমানের হাত ধরে চলে আসা বর্তমান প্রকল্পটিই এ যাবত কালের সব চেয়ে বড় প্রকল্প। যেটি বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছেন বতর্মান সাংসদ আবদুল্লাহ আল মামুন।
ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (IWM) রামগতি-কমলনগরের মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনরোধে ৩টি পর্যায়ে মোট ৭ বছরে বাস্তবায়ন যোগ্য ১০৯৮ কোটি টাকা ব্যয় সম্বলিত প্রতিরক্ষামূলক বাঁধ নির্মাণের জন্য এ প্রকল্পটি প্রস্তাবনা দেয়।



0Share