কামরুল হাসান হৃদয়: যাওয়ার কথা ছিল সেতু দিয়ে, নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে। কিন্তু বাস্তবে একগাছি মোটা রশি আর জরাজীর্ণ নৌকাই যখন শেষ ভরসা, তখন প্রতিদিনের পথচলা রূপ নেয় আতঙ্কে। আধুনিক যাতায়াতের সব গল্প রহমতখালী নদীর তীব্র স্রোতে এসে ফিকে হয়ে যায়। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ২১ নং টুমচর ইউনিয়নের ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডের হাজারো মানুষের কাছে এই নদী পারাপার এখন এক দুঃস্বপ্ন। একটি স্থায়ী সেতুর অভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা বয়ে চলেছেন এই আদিম দুর্ভোগ।
সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর দুই পাড়ে শক্ত করে বাঁধা রশি ধরে টেনে টেনে নৌকা এপার ওপার করা হচ্ছে। নামমাত্র ভাড়ায় একজন মাঝি থাকলেও নদীর তীব্র স্রোত সামলাতে মূলত যাত্রীদেরই পেশিশক্তির ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে শিশু, বৃদ্ধ ও নারীদের পড়তে হচ্ছে চরম ভোগান্তিতে। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি ও স্রোত বেড়ে গেলে এই পারাপার রীতিমতো আতঙ্কের হয়ে ওঠে। পিচ্ছিল রশিতে হাত ঘষা লেগে কেটে যাওয়া ও রক্তাক্ত হওয়া এখানে নিত্যদিনের ঘটনা। রশির ঘর্ষণে হাতের তালুতে কড়া পড়ে গেছে শত শত মানুষের।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, গত ছয় মাসেই রশি টানা নৌকা উল্টে অন্তত পাঁচটি বড় ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। প্রতিবার নৌকা উল্টে নদীতে তলিয়ে গেছে শিক্ষার্থীদের বইখাতা, কৃষকদের সার বীজ ও অন্যান্য মূল্যবান মালামাল। দক্ষিণ কালিরচর তালপট্টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মারিয়ে আক্তার জানায়, নৌকায় করে স্কুলে আসতে খুব কষ্ট হয়, আমাদের একটা সেতু দরকার।
শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষি অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাতের বেলা কোনো মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া মানে জীবন মৃত্যুর কঠিন পরীক্ষায় নামা। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রশাসনের উচ্চপর্যায় থেকে বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত সেতুটি আজও সরকারি নথির ভাঁজেই আটকে আছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে এলজিইডির উপ সহকারী প্রকৌশলী বেল্লাল হোসেন জানান, এলাকাটি ইতোমধ্যে জরিপ করা হয়েছে। আবাসন সেন্টার, তালপট্টি ও জলাইজ্জার খেয়া স্থানে মোট তিনটি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন পেলে দ্রুতই কাজ শুরু হবে বলে তিনি জানান।
তবে দ্রুত সময়ের শেষ কোথায়, তা আজও অজানা কালিরচরবাসীর কাছে। কোনো বড় ক্ষতির আগেই রশি টানা এই ঝুঁকিপূর্ণ পারাপারের অবসান ঘটিয়ে একটি নিরাপদ সেতুতে পা রাখার আশায় দিন গুনছেন তারা।



0Share