ইনতিয়াজ রাকিব | ঢাকার ব্যস্ততম এলাকার মাঝেই এমন একটি জায়গা আছে, যেখানে প্রতিদিন থেমে যায় মানুষের জীবনের ব্যস্ততা। চারপাশে হাজারো মানুষের ছুটে চলা, গাড়ির শব্দ আর উঁচু ভবনের ভিড়। অথচ মাত্র কয়েক পা এগোলেই যেন বদলে যায় পুরো দৃশ্য। সারি সারি কবর, নীরব পরিবেশ আর অসংখ্য মানুষের শেষ ঠিকানা। এটি রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী আজিমপুর কবরস্থান। শত বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে রাজধানীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থান শুধু একটি সমাধিস্থল নয়, এটি ঢাকার পরিবর্তনশীল ইতিহাসেরও এক নীরব সাক্ষী। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এখানে আসেন প্রিয়জনের কবর জিয়ারত করতে, আর প্রতিদিনই নতুন মানুষ এই মাটির ঠিকানায় জায়গা করে নেন।
প্রায় ২৭ একর জমির ওপর ছড়িয়ে থাকা এই আজিমপুর কবরস্থানটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম ও ঐতিহাসিক একটি কবরস্থান। তথ্য অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর আগে মোঘল আমলে এই স্থানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। এরপর সময় গড়িয়েছে, ঢাকা প্রসারিত হয়েছে, কিন্তু আজিমপুরের এই নীরব চত্বরটি প্রতিদিন নীরবে ধারণ করে চলেছে হাজারো মানুষের শেষ যাত্রাকে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই কবরস্থানে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৫টি মরদেহ দাফন করা হয়। ঢাকার বুক থেকে প্রতিনিয়ত বিদায় নেওয়া অসংখ্য সাধারণ মানুষের পাশাপাশি এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন দেশের বহু ভাষা শহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবী এবং প্রখ্যাত কৃতি সন্তানেরা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই কয়েক দশমিক একর জায়গায় এখন পর্যন্ত কত মানুষকে সমাহিত করা হয়েছে? সেই হিসাব কি কারও কাছে আছে?
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, আজিমপুর কবরস্থানের পুরোনো অংশের আয়তন ৩৫ একর। সংরক্ষিত কবর রয়েছে ২ হাজার ৬০০টি। অন্যদিকে ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদনে প্রায় ৩৪ একর জায়গায় ৩ হাজার ৯০০টির বেশি স্থায়ী কবর এবং বিপুলসংখ্যক অস্থায়ী কবরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ সময় ও হিসাবের ধরন অনুযায়ী সংখ্যায় পার্থক্য রয়েছে। তবে বিভিন্ন সময়ের প্রতিবেদনে কবরের সংখ্যা ও আয়তনে কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়। এর কারণ কবরস্থানের পুরোনো ও নতুন অংশ, ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন এবং একই স্থানে সময়ের ব্যবধানে পুনরায় দাফনের বিষয়টি।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, আজিমপুরে এ পর্যন্ত মোট কতজনকে দাফন করা হয়েছে, তার নির্ভুল ও পূর্ণাঙ্গ সরকারি সংখ্যা প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে এখানে প্রায় ৩০ হাজার কবর থাকার তথ্য এসেছে। কিন্তু কবরের সংখ্যা আর দাফন হওয়া মানুষের সংখ্যা এক নয়। কারণ জায়গার সংকটের কারণে পুরোনো কবরের ওপরও নির্দিষ্ট সময় পর নতুন করে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। তাই শুধু বর্তমান কবরের সংখ্যা দিয়ে কয়েক শতাব্দীতে মোট কত মানুষ এখানে শায়িত হয়েছেন, তা নির্ভুলভাবে বলা সম্ভব নয়।
তবে প্রতিদিনের দাফনের পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, এই কবরস্থানের ওপর কতটা চাপ রয়েছে। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে আজিমপুরে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ জনের দাফনের তথ্য এসেছে। অর্থাৎ শুধু বর্তমান হারের হিসাব ধরলেও বছরে প্রায় ১১ হাজার থেকে সাড়ে ১২ হাজার দাফন হতে পারে। আবার অন্য সময়ে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ জনের দাফনের তথ্যও পাওয়া গেছে। তাই বছরভেদে সংখ্যাটি পরিবর্তিত হয়।
আজিমপুর কবরস্থানের ইতিহাসও কম পুরোনো নয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা পোর্টালে বলা হয়েছে, ধারণা করা হয় সপ্তদশ শতাব্দীতে ঢাকা শহরের বিকাশের সময় থেকেই এই কবরস্থানের সূচনা। এখানে ভাষাশহীদসহ দেশের অনেক পরিচিত মানুষের কবর রয়েছে। সময়ের সঙ্গে কবরস্থানটির ব্যবস্থাপনাতেও আধুনিক পরিবর্তন এসেছে। এখন কবরের তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থাও চালু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।
সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয়, যে শহরে মানুষ প্রতিদিন জায়গার জন্য ছুটছে, সেই শহরেই জীবনের শেষ ঠিকানার জায়গাটিও দিন দিন সীমিত হয়ে আসছে। আজিমপুর কবরস্থান তাই শুধু একটি কবরস্থান নয়, এটি ঢাকার ইতিহাস, নগরজীবন এবং সময়ের পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী। এখানে মোট কত মানুষকে দাফন করা হয়েছে, হয়তো তার পূর্ণ হিসাব কোনো দিনই পাওয়া যাবে না। কিন্তু প্রতিদিনের নতুন কবর আর পুরোনো কবরের সারি একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়—ব্যস্ত এই শহরে আমাদের সবার শেষ ঠিকানা শেষ পর্যন্ত কয়েক হাত মাটিই।



0Share