সব কিছু
facebook lakshmipur24.com
লক্ষ্মীপুর বৃহস্পতিবার , ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রামগতি শেখের কেল্লা

রামগতি শেখের কেল্লা

রামগতি শেখের কেল্লা

লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চর পোড়াগাছা ইউনিয়নের শেখ মুজিব স্মৃতি বিজড়িত শেখের কেল্লা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগার থেকে প্রত্যাবর্তনের পর দেশ গড়ার ডাক দেন। এর আগে তিনি ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সনে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর ২০ ফেব্রুয়ারি সর্বপ্রথম যে গ্রাম থেকে ‘দেশ গড়ার ডাক’ দিতে গেলেন সে গ্রামের নাম চর পোড়াগাছা। গ্রামটি বর্তমানে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলায় অবস্থিত ।

লক্ষ্মীপুর জেলার ইতিহাস গ্রন্থ লক্ষ্মীপুর ডায়েরি সূত্রে জানা যায়

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি (রামগতির বাসিন্দা, বর্তমানে প্রয়াত-২৩/০১/২০১৮) মাহফুজুল বারীর কাছ থেকে নদী ভাঙন কবলিত ভূমিহীন পরিবারগুলোর দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনে বঙ্গবন্ধু লক্ষ্মীপুরের রামগতি চরপোড়া গাছায় ছুটে আসেন। এটি সাবেক নোয়াখালী জেলাধীন রামগতি উপজেলার চর বাদাম ইউনিয়নের এক গ্রাম।

তিনি ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চর পোড়াগাছায় আসেন। তিনি ও তাঁর সফর সঙ্গীরা ২টি হেলিকপ্টার যোগে স্থানীয় বাগ্যারদোনা স্রোতহীন মেঘনা ঘেঁষে নতুন গড়ে উঠা চর কলাকোপা মৌজার চর পোড়াগাছা পৌঁছেন। সকাল ১০টায় হেলিকপ্টার থেকে বিশাল ব্যক্তিত্ব স্বপ্নমুখী বঙ্গবন্ধু নেমে আসেন। সেখানে তিনি একটি কিল্লায় দাড়িঁয়ে বক্তব্য দেন। জনগণের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘দেশ আমাদেরকেই গড়তে হবে, উৎপাদন বাড়াতে হবে, প্রত্যেক বাড়িতে একটি করে লাউ গাছ হলেও লাগাতে হবে।

স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে দেশ গড়ার কাজ ও অর্থনৈতিক মুক্তি আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে হবে’। সংক্ষিপ্ত ভাষণ শেষে কোদাল হাতে নিয়ে স্বহস্তে মাটি কেটে ওড়াতে দিলেন। তিনি সেখানে মাটি কেটে স্বেচ্ছাশ্রমে রাস্তা নির্মাণের কাজ উদ্বোধন করেন।

ওই দিন ২ কি:মি: ব্যাপী ওড়া কোদালসহ সোজা লাইন ধরে প্রায় ৪ (চার) হাজার স্বেচ্ছাকর্মী মুক্তিযোদ্ধা সমবায়ী যুবক গায়ে সাদা গেঞ্জি, পরণে প্যাঁচ দেওয়া লুঙ্গী গামছা পরে রাস্তা বরাবর একই সঙ্গে একই কমান্ডে ঢোল সহরতের তালে তালে মাটি কেটে রাস্তা বাঁধার কাজ শুরু করলেন যা যথাসময়েই শেষ হলো। যে গ্রাম কিল্লায় দাঁড়িয়ে প্রথম দেশ গড়ার ভাষণ দিলেন, যেখান থেকে স্বেচ্ছাশ্রমে নিজ হাতে মাটি কেটে নোয়াখালী-রামগতি আঞ্চলিক সড়ক বাঁধার কাজ উদ্বোধন করলেন, সেই কিল্লাই আজ ‘শেখের কিল্লা’ নামে পরিচিত।

এই কিল্লাকে ঘিরে ও পাশেই গড়ে উঠেছে দেশের প্রথম ‘গুচ্ছগ্রাম’ যা আজ সারা দেশে ঠিকানা, আদর্শগ্রাম-গুচ্ছগ্রাম-আশ্রয়ণ প্রকল্প নামে ভূমিহীন ছিন্নমূলদের জন্য স্থাপন করা হচ্ছে।

১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চর পোড়াগাছা ইউনিয়নে ৫৯০ একর জমিতে ভূমিহীনদের পুনর্বাসনের জন্য গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প উদ্বোধন করেন বঙ্গবন্ধু। ওই স্থানে তিনি নিজ হাতে কয়েক মুঠি মাটি ফেলে প্রকল্পের মাটি ভরাট কাজের সূচনা করেন। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু নিজ হাতে মাটি ভরাটকৃত স্থানটি ‘শেখের কেল্লা’ হিসেবে স্থানীয়ভাবে পরিচিতি পায়। এ প্রকল্পে দুইশ’ ভূমিহীন পরিবারের প্রত্যেককে আড়াই একর ও দশ পরিবারের প্রত্যেককে ৩০ শতাংশ করে জমি বরাদ্দ দেয়া হয়। পরে ১৯৭২-৭৪ সালে বরাদ্দ পাওয়া পরিবারগুলো এ স্থানে তাদের বসতি গড়েন।

সাবেক রামগতি উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওয়াহেদ জানান, ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তিনিও কয়েক হাজার মানুষের মতো গুচ্ছগ্রামে বঙ্গবন্ধুকে দেখতে গিয়েছিলেন। ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর লক্ষ্মীপুরের এ গুচ্ছ গ্রামেই প্রথম সফর করেন বঙ্গবন্ধু।

অন্যদিকে: ২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত শেখের কিল্লা স্থানটি পরিদর্শন করেন। তখন সর্বসম্মতিক্রমে জাতির পিতার স্মৃতি রক্ষায় সেখানে শেখের কিল্লার পরিবর্তে বঙ্গবন্ধু শেখের কিল্লা নামকরণ করার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় বঙ্গবন্ধুর পদধূলি পড়ার সঠিক স্থানটি চিহ্নিত করে ‘বঙ্গবন্ধু শেখের কিল্লা স্মৃতি স্তম্ভ’ নির্মাণের আশ্বাস দেন। বর্তমানে সেখানে স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ হচ্ছে।

চর পোড়াগাছায় বঙ্গবন্ধুর দেওয়া সেদিনের বক্তব্য শুনেছেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ডর্প’র প্রতিষ্ঠাতা ও গুসি আর্ন্তজাতিক পুরষ্কার বিজয়ী এএইচএম নোমান। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, কিল্লার স্থানে একটি স্মৃতি স্তম্ভ, পর্যটক রেস্ট হাউজ, স্থানীয় সংস্কৃতি, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ইতিহাসসহ পাঠাগার সম্বলিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখের কিল্লা স্বপ্ন কমপ্লেক্স’ স্থাপন অত্যন্ত প্রয়োজন। এতে স্থানটির গুরুত্ব বাড়বে এবং মেঘনার নদীসহ একটি পর্যটন এলাকা গড়ে উঠবে।

=====

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ‘প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে’ ( ১২ নভেম্বর ‘৭০ এর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস বিধ্বস্ত) তৎকালিন নোয়াখালীর রামগতি সফর শুরু করেন। সেখান থেকে তিঁনি ভোলা যাবেন।
 
তিঁনি রামগতিতে কৃষি বিপ্লবের ডাক দিয়েছেন। তিঁনি সেখানে জনগণের স্বেচ্ছাশ্রমে একটি উপকূলীয় বাধ নির্মাণ প্রকল্প উদ্বোধন করেন। এ বাঁধ নির্মাণে কয়েক হাজার সেচ্ছাসেবী কাজ করছে। পানি সম্পদ মন্ত্রী খন্দকার মোস্তাক আহমেদ ও রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমেদ এ সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সফর সঙ্গী ছিলেন।
 
রামগতির মেঘনার চরে এক জনসভায় তিনি বলেন, “বাংলাদেশে ১ ইঞ্চি জমিও অনাবাদী রাখা যাবে না। তিনি বলেন এ সরকার জনগণের সরকার, সাধারণ মানুষের সরকার। তিঁনি বলেন আমাদের এমন একটি সমাজ গড়ে তূলতে হবে যে সমাজে এ কৃষকরা এ শ্রমিকরা এ ক্ষুধার্ত জনগণ আবার হাসতে পারবে। তিঁনি বলেন জনগণের ন্যূনতম চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হলে দেশের স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়বে। কাজেই স্বাধীনতা সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি মূলত সংগ্রাম কেবল শুরু হয়েছে। তিঁনি বলেন এবারের সংগ্রাম সোনার বাংলা গড়ে তোলার সংগ্রাম। তিঁনি বলেন আমাদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এখনও শেষ হয়নি, এর বিরুদ্ধে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। তিঁনি বলেন কারো কাছে আলাদীনের চেরাগ নেই। রাতারাতি এসব সমস্যা সমাধান কারো পক্ষে সম্ভব নয়। নিষ্ঠার সাথে কঠোর পরিশ্রম করে এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে।
 
তিঁনি জনগণের কাছে জানতে চান রাস্তা বাঁধ সেতু নির্মাণে তারা স্বেচ্ছাশ্রম দিতে রাজী কিনা জনতা হা সূচক জবাব দেয়। তিঁনি বলেন দুষ্কৃতিকারীদের কঠোর হস্তে দমন করা হবে। তিঁনি বলেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীরা সকলেই আমার কাছে অস্ত্র সমর্পণ করেছে কিন্তু কিছু দুষ্কৃতিকারী এবং পাকিস্তানী দালালরা তাদের কাছে এখনো অস্ত্র রেখে দিয়েছে। এসকল দালালদের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে তা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করার জন্য তিঁনি জনগণের প্রতি আহবান জানান। তিঁনি বলেন আমি আঠারো থেকে বিশ ঘণ্টা কাজ করি। তিঁনি সকলকে আরও পরিশ্রম করার আহবান জানান। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ভূট্টো বাঙ্গালীদের ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করেছেন তাই তিঁনি সেখানকার বাঙ্গালীদের নিয়ে খুব উৎকণ্ঠিত।”
 
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভোলার শান্তির হাটে এক জনসমাবেশে বলেছেন, “পরিবার প্রতি কারো একশত বিঘার বেশী জমি থাকবে না প্রয়োজনে এ সিলিং আরও কমানো হতে পারে। ফলে বাড়তি যে জমি পাওয়া যাবে তা সরকারের খাস খতিয়ানে এনে ভূমিহীন গরীবদের বন্দোবস্ত দেয়া হবে।”
 
 
বিকেলে তিনি ভোলার দৌলতখানে এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। উভয় সফরে তিঁনি প্রকাশ করেন, এদেশে কারো একশ বিঘার বেশী জমি রাখতে দেয়া হবে না।
 
এ বিষয়ে যুদ্ধকালীন মুজিব বাহিনীর রামগতি-হাতিয়া জোন কমান্ডার, তৎকালীন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং সাবেক সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা মোশারফ হোসেন বলেন, প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস বিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শন ও বাংলাদেশে প্রথম স্বেচ্ছাশ্রমে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের উদ্বোধন করতে বঙ্গবন্ধু রামগতি আসেন। আমরা রামগতির মুক্তিযোদ্ধারা গার্ড দিয়ে এবং মাটি দিয়ে বর্তমান বেড়িবাঁধের বাইরে বক্তৃতার মঞ্চ করি। এসময় মাটি কেটে আলেকজান্ডার-সোনাপুর সড়কের উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন করেন বঙ্গবন্ধু।
যুদ্ধকালীন মুজিব বাহিনীর রামগতি থানার ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মশিউল আলম হান্নান (সুইডেন প্রবাসী) বলেন, সেইদিন বঙ্গবন্ধুর দেশ পুনর্গঠনের আহবানে সাড়া দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাগণ, ছাত্র ও যুব সমাজ দেশ গড়ার জন্য একত্রিত হয়েছে। সেদিনের সাড়া জাগানো শ্লোগান ছিল: ‘চলো চলো বান্দের (বাঁধের) হাট’, ‘এসো এবার দেশ গড়ি’।
 
 
 
 
 
তথ্য সূত্রঃ
যুদ্ধকালীন মুজিব বাহিনীর রামগতি-হাতিয়া জোন কমান্ডার, তৎকালীন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সাবেক সাংসদ বীর মুক্তিযোদ্ধা মোশারফ হোসেন, যুদ্ধকালীন মুজিব বাহিনীর রামগতি থানার ডেপুটি কমান্ডার, বীর মুক্তিযোদ্ধা মশিউল আলম হান্নান।

ইতিহাস ও ঐতিহ্য আরও সংবাদ

অবসর কাটানোর জন্য লক্ষ্মীপুরের কয়েকটি জায়গা

জমিদার ভবাণী সাহা

Lakshmipur | লক্ষ্মীপুর | লক্ষ্মীপুর জেলার ইতিহাস | লক্ষ্মীপুর জেলার পরিচিতি

রামগতি শেখের কেল্লা

ঐতিহ্যবাহী রামগতির মিষ্টি

লক্ষ্মীপুর মটকা মসজিদ ভাঙ্গা হয়েছে ২০১৮ সালে | এখনো জীবন্ত আছে ডিসি ওয়েবসাইটে

Lakshmipur24 | লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোর বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রনালয়ে নিবন্ধিত নিউজপোর্টাল  
 All Rights Reserved : Lakshmipur24.Com ©2012- 2026
Editor: Sana Ullah Sanu
Muktizudda Market (3rd Floor), ChakBazar, Lakshmipur, Bangladesh.
Ph:+8801511022222, WhatsApp , email: news@lakshmipur24.com