নিজস্ব প্রতিনিধি: পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে পৃথিবীর ছয়টি মারাত্মক দুর্যোগ প্রবণ এলাকার অন্যতম। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশের ইতিহাসের ভয়াবহতম ঘূর্ণিঝড় যা আঘাত হেনেছিল উপকূলীয় ভূখণ্ডের কক্সবাজার, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, বাঁশখালী, আনোয়ারা, চকরিয়া, সন্ধীপ, সীতাকুণ্ড ও হাতিয়ায়।
তার কথায়, “প্রকৃতির মাধ্যমেই প্রাকৃতিক বিভিন্ন দুর্যোগকে ট্যাকেল করতে হবে।”
বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘উপকূল বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে’ শীর্ষক সভায় কথা বলছিলেন এ্যানি। উপকূলীয় উন্নয়ন ফাউন্ডেশন এই সেমিনারের আয়োজন করেছে।
তিনি বলেন, প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে উপকূল অঞ্চলের মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সাইক্লোন, বন্যা ও প্লাবনের হাত থেকে উপকূলকে বাঁচাতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার তাগিদ দেন তিনি।
এ্যানি বলেন, “১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ঘূর্ণিঝড় যখন আঘাত হেনেছিলে তখন বিএনপি সরকারের বয়স ছিলো মাত্র তিন মাস। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছিল।”
সরকারের খাল খনন কর্মসূচি নিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচিকে পুনরুজ্জীবিত করছে। আগামী ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল, পুকুর এবং জলাধার খনন ও পুনঃখনন করা হবে। এছাড়া এই সময়ের মধ্যে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ করা হবে যা উপকূলীয় অঞ্চলে সবুজ বেষ্টনী তৈরি করবে।
উপকূলীয় উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব ও মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন।
তিনি বলেন, ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছরই প্রাকৃতিক দূর্যোগ কবলিত হয়ে পড়ে। তাই উপকূলীয় এলাকায় বসবাসরত জনসাধারণের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধানসহ নূতন জেগে উঠা চরাঞ্চলকে স্থায়িত্ব দেওয়ার লক্ষে ১৯৬৬ সাল থেকে বন বিভাগ উপকূলীয় এলাকায় নূতন জেগে উঠা চরাঞ্চলে বনায়ন কার্যক্রম শুরু করে।
বাংলাদেশে দীর্ঘ ৭১৬ কি.মি. দীর্ঘ উপকূলীয় এলাকায় সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে পারলেই প্রতি বছর প্রাকৃতিক দূর্যোগ থেকে উপকূলীয় এলাকার জনগণ রক্ষা পেতে পারে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসের জন্য সভায় ১০টি তুলে ধরা হয়।
১. ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে জীবন বাঁচাতে গাছপালা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়ে বেঁচে যাওয়া অধিকাংশ লোকেরই বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন ছিল গাছ। এছাড়া গাছপালা উপকূলীয় ভূমির ক্ষয়রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সবুজ বেষ্টনী বা বনাঞ্চল ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বা বেগ হ্রাস করতে পারে। তাই উপকূলীয় বনায়ন কার্যক্রম সফল করার জন্য সর্বমহলে সচেষ্ট হওয়া উচিৎ। ব্যক্তিগতহীন স্বার্থে যারা বনায়ন ধ্বংসের মাধ্যমে ভূমি দখল প্রক্রিয়ায় জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। সরকার গৃহীত আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছের চারা লাগানোর মহতী উদ্দোগে উপকূলীয় এলাকাকে প্রাধান্য দেওয়ার জোর দাবি জানাই।
২. এলাকা ভিত্তিক পর্যাপ্ত ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। অন্য সময়ে এসব আশ্রয়কেন্দ্র মসজিদ, মাদ্রাসা, বিদ্যালয় বা অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু হিসাবেও ব্যবহৃত হতে পারে। দূর্যোগকালীন সময়ে উপকূলবাসীর বাড়ীঘর বা মালামালের নিরাপত্তার ব্যবস্থা প্রদান করতে হবে।
৩. কমপক্ষে ১০ মিটার উচু বেড়ীবাধ নির্মান করতে হবে। উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালী করা এবং লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বেড়িবাঁধ বনায়নে ফল ও ঔষধী গাছের প্রাধান্য থাকা উচিত। প্রয়োজনে বেড়িবাঁধ সড়ক যোগাযোগের বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে ব্যবহৃত হতে পারে।
৪. দ্রুত বিপদ সংকেত পাঠানোর জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ দূর্যোগকালীন সময়ে সার্বক্ষণিক অফিস খোলা ও বার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা করা।
৫. উপকূল উন্নয়নে আলাদা ‘উপকূলীয় মন্ত্রনালয়’ গঠন করা।
৬. জাতীয় জলবায়ু ও অর্থনৈতিক নীতিতে সমুদ্রভিত্তিক কার্বন সঞ্চয় এবং স্থানীয় কমিউনিটি-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনার অন্তর্ভুক্তি।
৭. সমন্বিত উপকূলীয় সম্পদ ডেটাবেস শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চল ব্যবস্থাপনার আওতাধীন করা।
৮. দূর্যোগ মোকাবিলা প্রস্তুতি: জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ।
৯. দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের লবন চাষীদের বেঁচে থাকার জন্য লবনের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা।
১০. উপকূল অঞ্চলের মানুষের জন্য নিরাপদ ও দ্রুত যোগাযোগের ব্যবস্থা গ্রহণ।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মো. মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ, চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা জহিরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আকবর খানের সঞ্চালনায় জাতীয় সেমিনার ও স্মরণ সভায় প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন উপকূলীয় উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের সহ-সভাপতি সানা উল্লাহ, কোস্টাল জার্নালিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আতা উল্লাহ খান, মহেশখালী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন, সাবেক জেলা যুগ্ম-জজ সাজ্জাদ হোসাইনসহ আরও অনেকে।



0Share