আশরাফুল আলম হান্নান: ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি—বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কলঙ্কিত ও রক্তাক্ত দিন। বাংলাদেশ রাইফেলস-এর সদর দপ্তর পিলখানায় যে নির্মম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল, তা জাতিকে আজও শোকাহত করে। সেদিন হাজার হাজার সশস্ত্র জওয়ান দরবার হলে ও আশপাশে সেনা কর্মকর্তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায়।
কেউ কেউ হয়তো এই হত্যাকাণ্ডের সমর্থক ছিলেন না, কিন্তু প্রকাশ্য প্রতিরোধও ছিল না বললেই চলে। এই বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মধ্যেও একজন মানুষ আলাদা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন—আমার বাবা, তৎকালীন কেন্দ্রীয় সুবেদার মেজর নুরুল ইসলাম। সেদিন সকালে আমার পরীক্ষা ছিল। বাবা আমাকে বলেছিলেন, “খাবার খেয়ে পরীক্ষা দিতে যেও।” কিন্তু নিজে আর নাশতা করেননি। দরবারে দেরি হয়ে যাবে—এই তাড়নায় দ্রুত বেরিয়ে যান বাসা থেকে। আমরা জানতাম না, সেটিই হবে তার সঙ্গে শেষ দেখা। দরবার হলে যখন হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়, অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছিলেন।
কিন্তু বাবা এগিয়ে যান সশস্ত্র জওয়ানদের শান্ত করতে। মহাপরিচালকের নির্দেশে তিনি মাইক হাতে নিয়ে বারবার অনুরোধ জানান—শান্ত হতে, শৃঙ্খলায় ফিরতে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতি অবিচল আনুগত্য ও সৈনিকসুলভ দৃঢ়তা দেখিয়ে তিনি হত্যাকাণ্ডে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এই সাহসিকতার মূল্য তিনি জীবন দিয়ে দেন। হত্যাকারীরা তার কাছ থেকে মাইক কেড়ে নেয়, লোহার স্ট্যান্ড দিয়ে নির্মমভাবে আঘাত করে, শরীর ক্ষতবিক্ষত করে এবং পরে গুলি চালায়। এরপর তাকে গণকবরে নিক্ষেপ করা হয়। সাত দিন আমরা বাবাকে খুঁজেছি। এমন কোনো হাসপাতাল নেই, যেখানে যাইনি। কেউ বলেনি, তাকেও হত্যা করা হয়েছে। অবশেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এর মর্গে বাবার মরদেহ পাই।
পরে ৪ মার্চ, লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চরলক্ষ্মী গ্রামের বাড়িতে তাকে দাফন করা হয়। পরবর্তী তদন্তে বাবার বীরত্বের কথা প্রকাশ্যে আসে। হত্যাকাণ্ডের ছয় মাস পর তিনি একমাত্র বিডিআর সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদের মর্যাদা পান। পরবর্তীতে তাকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-এর সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক “বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ পদক”-এ ভূষিত করা হয়। কর্মজীবনে তিনি চারবার ডিজি পদক পেয়েছেন। অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য সরকারিভাবে পবিত্র হজব্রত পালনের সুযোগ পান। তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ বিওপি কমান্ডার ও শ্রেষ্ঠ কোম্পানি কমান্ডার। চোরাচালান রোধে বিশেষ পুরস্কার অর্জন করেন।
দীর্ঘ আট বছর রাইফেলস ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০২১ সালে পাদুয়া যুদ্ধে সংগ্রাম ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বাবা ছিলেন একজন পরহেজগার মানুষ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন, নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত করতেন। প্রতি শুক্রবার দাড়ি ও চুলে মেহেদি লাগাতেন। তার জীবনে শৃঙ্খলা, সততা ও ঈমান ছিল অবিচল। ২৫ ফেব্রুয়ারির সেই ঘটনায় পিলখানায় প্রায় ৯ হাজার এবং সারা দেশে ৫০ হাজারের বেশি বিডিআর সদস্য উপস্থিত থাকলেও অফিসারদের জীবন রক্ষায় বাধা দিতে গিয়ে প্রাণ উৎসর্গ করেছেন—এমন উদাহরণ ছিল না।
আমার বাবা সেই ব্যতিক্রম। আমি একজন শহীদের সন্তান হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে আবেদন জানাই—আমার বাবার এই অসীম সাহসিকতা ও দৃষ্টান্তমূলক আচরণের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে বীরত্বসূচক রাষ্ট্রীয় খেতাবে ভূষিত করা হোক। একইসঙ্গে আমি সঠিক তদন্তের মাধ্যমে এই ঘটনার প্রকৃত কুশীলব ও হত্যাকারীদের পূর্ণ বিচার বাস্তবায়নের দাবি জানাই। “শহীদ সেনা দিবস” রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক দিবস হিসেবে পালন, শহীদদের যথাযথ মূল্যায়ন এবং তাদের পরিবারের সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করা হোক। আমার বাবা নুরুল ইসলাম কেবল আমার বাবা নন—তিনি ছিলেন কর্তব্য, সাহস ও আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল প্রতীক। রাষ্ট্র যদি বীরদের যথাযথ মর্যাদা দেয়, তবেই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শিখবে—অন্যায়ের সামনে দাঁড়ানোই সত্যিকারের বীরত্ব।
লেখক: শহীদ নুরুল ইসলামের বড় ছেলে



0Share