সোলায়মান হাজারী ডালিম|| সম্প্রতি কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, স্বাধীনতা দিবসের একটি অনুষ্ঠান থেকে একজন ব্যক্তি জিলাপির বাজার নিয়ে একটি ফেসবুক পেজে সরাসরি সম্প্রচার করছেন। তিনি নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে উপস্থাপন করলেও তার কর্মকাণ্ডে সাংবাদিকতার ন্যূনতম মানদণ্ডেরও প্রতিফলন নেই। তথ্য যাচাই, প্রাসঙ্গিকতা, জনস্বার্থ, এসব মৌলিক বিষয় উপেক্ষা করে এমন উপস্থাপনাকে সাংবাদিকতা বলা যায় না; বরং এটি পেশাটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তবে প্রশ্ন হলো, এটাই কি আমাদের সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সংকট? আমার মতে, না। বরং এর চেয়েও ভয়ংকর এক ধরনের সাংবাদিকতা নীরবে, আড়ালে-আবডালে এই দেশে বিস্তার লাভ করেছে, যা নিয়ে আমরা খুব কমই কথা বলি।
ঢাকা শহর কিংবা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন অনেক ‘সাংবাদিক’ আছেন, যাদের জীবনযাত্রা চোখ ধাঁধানো। ব্যক্তিগত গাড়ি, বিলাসবহুল বাসা, অভিজাত জীবন- সবই আছে। অথচ তাদের আনুষ্ঠানিক বেতন বা আয় এমন নয়, যা দিয়ে এই জীবনধারা বজায় রাখা সম্ভব। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে- এই অর্থের উৎস কোথায়? এই প্রশ্নটাই আমরা করতে ভয় পাই, কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাই।
আরেক শ্রেণির তথাকথিত সাংবাদিক আছেন, যারা বছরে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিবেদনই তৈরি করেন না। গণমাধ্যমে তাদের উপস্থিতি প্রায় অদৃশ্য। অথচ তারাই বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন, ইউনিয়ন ও প্রেসক্লাবের গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে রাখেন। এসব প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে তারা প্রভাব বিস্তার করেন, সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করেন এবং নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেন। ফলে প্রকৃত সাংবাদিকরা অনেক সময়ই কোণঠাসা হয়ে পড়েন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো-কিছু ব্যক্তি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে সরাসরি রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেন। তারা খবর তৈরি করেন না, বরং ‘ন্যারেটিভ’ তৈরি করেন। তথ্যকে বিকৃত করে, আংশিক সত্য উপস্থাপন করে কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে গুজব ছড়িয়ে তারা জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। এরা কার্যত সাংবাদিক নন; রাজনৈতিক কর্মী বা এজেন্ট। কিন্তু বাহ্যিক চাকচিক্য, প্রভাব-প্রতিপত্তি আর সংযোগের কারণে তাদেরই অনেক সময় ‘সফল সাংবাদিক’ হিসেবে দেখা হয়।
আবার এমন কিছু ‘সিনিয়র’ মুখও আমরা নিয়মিত দেখি, যারা টেলিভিশনের টকশোতে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নানা বিষয়ে বিশ্লেষণ দেন। রাষ্ট্রনীতি থেকে অর্থনীতি-সবকিছু নিয়েই তারা কথা বলেন। কিন্তু খোঁজ নিলে দেখা যায়, তাদের কোনো নির্দিষ্ট কর্মস্থল নেই, নেই ধারাবাহিক কোনো সাংবাদিকতা চর্চা। তবুও তারা বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন। প্রশ্ন হলো-এই আয়ের উৎস কী? তাদের জবাবদিহিতা কোথায়?
এই বাস্তবতায় নাগেশ্বরীর সেই ভাইরাল ভিডিওর ব্যক্তিকে আমরা সহজেই সমালোচনা করি, উপহাস করি। কারণ তিনি দৃশ্যমান, সরল এবং সহজ । কিন্তু শহরের ‘ভদ্রবেশী’ এই বড় ধরনের অনিয়মগুলো নিয়ে আমরা নীরব থাকি। অথচ প্রকৃত ক্ষতিটা সেখানেই বেশি। কারণ তারা শুধু পেশার মান নষ্ট করছেন না, বরং গণমাধ্যমের ওপর মানুষের আস্থাকেও ধ্বংস করছেন।
সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল পেশা- এখানে সততা, জবাবদিহিতা এবং জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা অপরিহার্য। এই পেশাকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল, ক্ষমতার অপব্যবহার বা প্রভাব খাটানো শুধু অনৈতিকই নয়, বিপজ্জনকও।
মাঠের একজন নগণ্য সাংবাদিক হিসেবে আমার বিশ্বাস-শুধু প্রান্তিক বা অদক্ষ ব্যক্তিকে সমালোচনা করলেই চলবে না। বরং সাহস থাকলে আমাদের সেইসব প্রভাবশালী, মুখোশধারী ‘সাংবাদিকদের’ বিরুদ্ধেও কথা বলতে হবে। নইলে এই পেশার মর্যাদা রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
লেখক:
সোলায়মান হাজারী ডালিম,
সাংবাদিক, এখন টেলিভিশন এবং বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর, ফেনী।



0Share