সব কিছু
লক্ষ্মীপুর , ,
বদলি যখন বাণিজ্য, লটারি তখন সমাধানের পথ

বদলি যখন বাণিজ্য, লটারি তখন সমাধানের পথ

বদলি যখন বাণিজ্য, লটারি তখন সমাধানের পথ

বিশেষ প্রতিনিধি: সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়নকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে প্রথমবারের মতো লটারি পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া এই পদক্ষেপ সফল হলে সরকারি প্রশাসনে বদলি বাণিজ্য বন্ধের ক্ষেত্রে এটি একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

সম্প্রতি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাবরেজিস্ট্রারদের বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে লটারির মাধ্যমে পদায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে নির্ধারিত সময়ে এ লটারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ঢাকা জেলার সাবরেজিস্ট্রি অফিসগুলোর জন্য নির্ধারিত পদগুলোতে দেশের বিভিন্ন জেলার সাবরেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত সাবরেজিস্ট্রারদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে বদলি করা হবে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের উপস্থিতিতে এ কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে বদলি ও পদায়নকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। বিশেষ করে ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। সাবরেজিস্ট্রারের পদও এর বাইরে নয়। অভিযোগ রয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ ও আর্থিকভাবে লাভজনক কিছু এলাকায় পদায়ন পেতে অনৈতিক লেনদেনের আশ্রয় নেওয়া হয়। ফলে একজন কর্মকর্তা যদি কোনো পদে যেতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর সেই অর্থ তুলে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।

বদলি বাণিজ্যের এই সংস্কৃতি কেবল সাবরেজিস্ট্রি অফিসেই সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে পছন্দের কর্মস্থল, গুরুত্বপূর্ণ পদ কিংবা আর্থিকভাবে সুবিধাজনক এলাকায় পদায়নকে কেন্দ্র করে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো পদ ও কর্মস্থলকে ঘিরে অতীতে বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগও গণমাধ্যমে এসেছে। একজন কর্মকর্তা যদি অর্থ ব্যয় করে একটি পদে দায়িত্ব নেন, তাহলে সেই বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার মানসিকতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর সেখান থেকেই দুর্নীতির চক্র আরও শক্তিশালী হতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের পদায়ন নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ও অভিজাত এলাকার থানাগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পাওয়া নিয়ে অতীতে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। শুধু ঊর্ধ্বতন পদ নয়, অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরের পদায়ন নিয়েও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ শোনা যায়। এসব অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্ন ওঠে—একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি দায়িত্ব পাওয়ার জন্য ঘুষ দেন, তাহলে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি কতটা সততা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারবেন?

নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি ও পদায়ন নিয়েও বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিচার বিভাগের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যদি বদলি ও পদায়ন নিয়ে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ থাকে, তাহলে তা পুরো বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

বন বিভাগ, গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও নির্দিষ্ট জেলা বা কর্মস্থলের পদকে বেশি আকর্ষণীয় মনে করা হয় এবং এসব পদে যেতে কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রতিযোগিতার সুযোগ নিয়েই একটি অনৈতিক লেনদেনের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। উচ্চপর্যায়ের কোনো কোনো পদ নিয়েও অতীতে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে।

ডাক্তারদের পদায়নেও বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। একজন চিকিৎসককে ঢাকায় বদলি হতে লাখ টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনেক চিকিৎসকই ঢাকার বাইরে কর্মরত থাকতে অনাগ্রহী। এর অন্যতম কারণ দেশের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার অতিরিক্ত ঢাকামুখী হয়ে পড়া। ফলে রাজধানীতে থাকার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয় এবং কাঙ্ক্ষিত কর্মস্থলে বদলি হতে নানা ধরনের তদবির ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে।

সরকারি চাকরি যাঁরা করেন, তাঁদের একটি বড় অংশ রাজধানীতে কর্মরত থাকতে চান—এটি বাস্তবতা। কিন্তু ১৮ কোটি মানুষের দেশে সবাই যদি ঢাকায় চাকরি করতে চান, তাহলে ঢাকার বাইরের বিপুল জনগোষ্ঠী সরকারি সেবা পাবে কীভাবে? চিকিৎসা, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, ভূমি, প্রকৌশলসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই ঢাকাকেন্দ্রিকতার প্রভাব দেখা যায়। আর এর পেছনে বদলি ও পদায়নের বর্তমান ব্যবস্থারও একটি বড় ভূমিকা রয়েছে।

এই বাস্তবতায় সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্তকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সংস্কার হিসেবে দেখা যেতে পারে। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—কোন কর্মকর্তা কোন কর্মস্থলে যাবেন, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রভাব, তদবির কিংবা আর্থিক লেনদেনের সুযোগ কমে আসবে। যোগ্য কর্মকর্তাদের নির্ধারিত তালিকা থেকে লটারির মাধ্যমে পদায়ন করা হলে বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অনিয়মের সুযোগ কমবে।

তবে শুধু লটারি চালু করলেই দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ হবে—এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। লটারির পাশাপাশি কর্মকর্তাদের যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, শৃঙ্খলা, কর্মস্থলের প্রয়োজন এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে লটারির পুরো প্রক্রিয়াটি প্রকাশ্য, প্রযুক্তিনির্ভর ও নিরীক্ষাযোগ্য হওয়া জরুরি। তাহলে এই উদ্যোগের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে।

সাবরেজিস্ট্রারদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি সফল হলে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদেও এর প্রয়োগ নিয়ে ভাবা যেতে পারে। যেমন জেলা প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যতার মানদণ্ড পূরণকারী কর্মকর্তাদের একটি স্বচ্ছ ফিট লিস্ট তৈরি করে সেখান থেকে নীতিমালার ভিত্তিতে লটারির মাধ্যমে কর্মস্থল নির্ধারণ করা যেতে পারে। একইভাবে থানার ওসি কিংবা চিকিৎসকদের বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন অনুযায়ী স্বচ্ছ ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব।

একজন কর্মকর্তা যদি ঘুষ বা তদবির ছাড়াই কোনো পদে দায়িত্ব পান, তাহলে সেই পদে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁর ওপর একটি নৈতিক দায় তৈরি হয়। তখন পদটি পাওয়ার বিনিময়ে অর্থ ফেরত তোলার মানসিকতা থাকার কথা নয়। বরং কর্মদক্ষতা, সততা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার মাধ্যমে নিজের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করবেন—এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা।

তাই সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতি চালুর উদ্যোগকে শুধু একটি বদলি প্রক্রিয়ার পরিবর্তন হিসেবে দেখলে হবে না। এটি সরকারি প্রশাসনে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা এবং বদলি-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে একটি নতুন ধারণার সূচনা করতে পারে। সরকার চাইলে এই অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করে অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিতে পারে।

দুর্নীতি কমাতে শুধু আইন করে বা শাস্তির ভয় দেখিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে এমন কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোও দূর করতে হবে। বদলি ও পদায়ন যদি সেই দুর্বলতার অন্যতম জায়গা হয়, তাহলে সেখানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।

সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতির এই উদ্যোগ তাই একটি সম্ভাবনাময় সূচনা। এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত ও নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করা গেলে সরকারি চাকরিতে বদলি-বাণিজ্য কমানোর পাশাপাশি প্রশাসনে জবাবদিহি, নিরপেক্ষতা ও জনসেবার মান বাড়াতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রতিবেদক

বাংলাদেশনিউজ আরও সংবাদ

উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসায় সফল হওয়া চ্যালেঞ্জের: গভর্নর

আইসিসিবির সুপারসেল কার বাজারে; বাড়ছে গাড়ি আর ক্রেতা

অ্যাম্বুল্যান্স থেকে জরুরি ওষুধ বসুন্ধরাবাসীর জন্য একাধিক সেবা

রামগতিতে ভার্চুয়ালি ‘কৃষক কার্ড’ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী

ফুটপাত জনগণের চলাচলের পথ, দখলদারদের জন্য নয়: ডিএনসিসি প্রশাসক

উপকূল ও চরাঞ্চলের মানষের চিকিৎসার জন্য নির্মাণ হচ্ছে ভাসমান হাসপাতাল ‘স্বাস্থ্য তরী’

তথ্য অধিদফতরের নিবন্ধন নং: 236  
 All Rights Reserved : Lakshmipur24 ©2012-2026
Chief Mentor: Rafiqul Islam Montu, Editor & Publisher: Sana Ullah Sanu.
Muktijudda Market (3rd Floor), ChakBazar, Lakshmipur, Bangladesh.
Ph:+8801794 822222, WhatsApp , email: news@lakshmipur24.com