ক্যাপ্টেন সাজ্জাদ চৌধুরী: সিঙ্গাপুরে চুইংগাম বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত কঠোর হলেও একে ‘অমানবিক’ বলা যায় না। বরং এটি ছিল লি কুয়ান ইউ এর ব্যবহারিক দূরদর্শিতা (Pragmatism) ও সুশাসনের (Good Governance) একটি চরম উদাহরণ।
কেন চুইংগাম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং এর পেছনের কারণগুলো বুঝতে পারলে লি কুয়ান ইউ এর দেশ পরিচালনার দর্শন স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
চুইংগাম কেন নিষিদ্ধ হয়েছিল?
আশি ও ৯০ এর দশকে সিঙ্গাপুরে নতুন চালু হওয়া এমআরটি (MRT) সাবওয়ে ট্রেনে কিছু লোক চুইংগাম খেয়ে ট্রেনের দরজার সেন্সরে লাগিয়ে রাখত। এর ফলে দরজার সেন্সর কাজ করত না, ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন ঘটত এবং কোটি কোটি ডলারের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়ত। এছাড়া সরকারি আবাসন (HDB) ভবনের লিফট, বেঞ্চ ও সরকারি স্থানে চুইংগামের ময়লা পরিষ্কার করতে সরকারের প্রচুর অর্থ ও শ্রম অপচয় হতো।
লি কুয়ান ইউ বিশ্বাস করতেন, ব্যক্তির ছোট্ট একটি অযৌক্তিক আনন্দের চেয়ে পুরো সমাজের সুশৃঙ্খল পরিবেশ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুরক্ষা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯২ সালে তাই চুইংগাম আমদানি ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয় (পরবর্তীতে ২০০৪ সালে চিকিৎসা বা দন্তচিকিৎসার উদ্দেশ্যে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে বিশেষ গাম ব্যবহারের ছাড় দেওয়া হয়)।
লি কুয়ান ইউ কি অমানবিক ছিলেন?
লি কুয়ান ইউ অমানবিক ছিলেন না, তবে তিনি ছিলেন এক কঠোর বাস্তববাদী ও শৃঙ্খলাপরায়ণ শাসক। তিনি অনুভূতির চেয়ে ফলাফলকে বেশি প্রাধান্য দিতেন। তাঁর শাসনপদ্ধতিকে প্রায়ই বলা হয় “Paternalistic Governance” বা পিতা রূপী শাসন, যেখানে একজন পিতা যেমন সন্তানের ভালোর জন্য কিছু কঠোর নিয়ম চাপিয়ে দেন, তিনিও ঠিক তা ই করেছিলেন।
তিনি বুঝেছিলেন, প্রাকৃতিক সম্পদহীন (এমনকি পানের পানিও মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করতে হতো) একটি ক্ষুদ্র দ্বীপদেশকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা ও জিরো-টলারেন্স আইন বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।
দেশ গড়ায় লি কুয়ান ইউ এর অসাধারণ কিছু উদাহরণ
মাত্র তিন দশকে তৃতীয় বিশ্বের একটি দরিদ্র, জঙ্গলঘেরা বন্দর থেকে সিঙ্গাপুরকে প্রথম বিশ্বের অন্যতম ধনী ও উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তর করার পেছনে লি কুয়ান ইউ এর গৃহীত কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ:
১. সর্বজনীন আবাসন নীতি (HDB Flat System):
স্বাধীনতার সময় সিঙ্গাপুরের অধিকাংশ মানুষ বস্তিতে বাস করত। লি কুয়ান ইউ ‘Housing Development Board (HDB)’ গঠন করে ৯০% নাগরিকের জন্য সাশ্রয়ী ও আধুনিক ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করেন। তিনি নিশ্চিত করেছিলেন যেন দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিজের একটি মাথার ওপর ছাদ থাকে, যা নাগরিকদের মনে দেশের প্রতি তীব্র মালিকানাবোধ তৈরি করে।
২. দুর্নীতি দমন ও কঠোর আইন প্রয়োগ:
তিনি ‘Corrupt Practices Investigation Bureau (CPIB)’-কে পূর্ণ স্বাধীনতা দেন। মন্ত্রী থেকে শুরু করে আমলা, দুর্নীতির ক্ষেত্রে কারো কোনো ছাড় ছিল না। সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি থেকে দূরে রাখতে তাদের বেতন বিশ্বমানের কর্পোরেট সিইও দের সমকক্ষ করা হয়েছিল, যেন অর্থের লোভে কেউ দুর্নীতি না করে।
৩. বর্ণবাদ দূরীকরণ ও সামাজিক ঐক্য:
সিঙ্গাপুরে চীনা, মালয় ও ভারতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। লি কুয়ান ইউ প্রতিটি সরকারি আবাসন ভবনে জাতিগত কোটা (Ethnic Integration Policy) বাধ্যতামূলক করেন, যাতে সব ধর্মের মানুষ পাশাপাশি বাস করতে বাধ্য হয়। এর ফলে জাতিগত ভেদাভেদ মুছে গিয়ে ‘সিঙ্গাপুরি’ পরিচয়ের জন্ম হয়।
৪. বাগানঘেরা শহর (Garden City Concept):
অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা ছিল তাঁর অগ্রাধিকার। তিনি পুরো সিঙ্গাপুরকে একটি সবুজ বাগানে রূপান্তর করার মহাপরিকল্পনা হাতে নেন। প্রতি বছর গাছ লাগানো ও রক্ষা করা ছিল নাগরিক ও প্রশাসনের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব।
৫. মেধাভিত্তিক শাসন (Meritocracy):
তিনি স্বজনপ্রীতি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের উর্ধ্বে উঠে শুধুমাত্র যোগ্যতার ভিত্তিতে দেশের নীতিনির্ধারক ও আমলা নির্বাচন করেছিলেন। মেধা অনুযায়ী সুযোগ পাওয়ার এই নীতিই সিঙ্গাপুরি প্রশাসনের দক্ষতার মূল ভিত্তি।
লি কুয়ান ইউ ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর কিছুটা কড়াকড়ি আরোপ করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে তাঁর দেশের মানুষকে দিয়েছিলেন নিরাপদ জীবন, দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং বিশ্বজুড়ে এক অনন্য সম্মান। চুইংগামের মতো সামান্য বিষয়কে কঠোর হাতে দমন করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন শৃঙ্খলা ছাড়া কোনো জাতির পক্ষে উন্নতির চূড়ায় পৌঁছানো সম্ভব নয়।
লেখক: লক্ষ্মীপুর জেলার বাসিন্দা, এএফএনআই (ইউকে) ও মাস্টার মেরিনার, সিঙ্গাপুর ।



0Share