সানা উল্লাহ সানু : লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার উত্তর চরপাগলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। গ্রাম এলাকায় অবস্থিত এই বিদ্যালয়টি অবস্থানগত দিক থেকে হয়তো অন্য অনেক বিদ্যালয়ের মতো-ই। তবে সাফল্যের গল্পে বিদ্যালয়টি যেন কিছুটা আলাদা।
তোরাবগঞ্জ হাইস্কুল ক্যাম্পাসে পরিচালিত বিদ্যালয়টি, প্রতিদিনের শিক্ষা কার্যক্রমে নিয়ম-শৃঙ্খলা, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি এবং শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় প্রাইমারি স্কুলটিতে গড়ে উঠেছে একটি ভিন্ন পরিবেশ।
আশপাশের অন্য যেসব প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষার্থী সংকট রয়েছে সেখানে, তোরাবগঞ্জ বাজারের উত্তর চর পাগলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রয়েছে প্রায় সাড়ে ৫শত শিক্ষার্থী এবং ১২ জন শিক্ষক। ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়টি এ অঞ্চলের শিক্ষা বিকাশের সবচেয়ে প্রাচীন প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয় অভিভাবকরা জানায়, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যালয়ে আসে শিক্ষার্থীরা। শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দিয়ে পাঠ গ্রহণ করে। শিক্ষকরাও নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ঘাটতি চিহ্নিত করে তা পূরণের চেষ্টা করেন। ফলে আর এই ধারাবাহিকতার প্রতিফলন দেখা যায় শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ফলাফলেও।
কয়েকজন অভিভাবক জানিয়েছেন, গত প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরে বিভিন্ন বার্ষিক পরীক্ষা, প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা এবং বৃত্তি পরীক্ষায় কমলনগর উপজেলার মেধাতালিকায় এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে।
অভিভাবকরা বলছে বছরের পর বছর মেধাতালিকায় জায়গা করে নেওয়ার এই ধারাবাহিকতাই বিদ্যালয়টির অন্যতম বড় অর্জন। তবে এই সাফল্যের পেছনে শুধু শিক্ষার্থীদের মেধাই না, রয়েছে শিক্ষকদের নিরলস পরিশ্রমও।
নির্ধারিত সময়ের ক্লাসের পাশাপাশি কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় ঘাটতি থাকলে তাকে বাড়তি সময় দিয়ে পড়ানোর চেষ্টা করেন শিক্ষকরা। অনেক সময় অভিভাবকদের অনুরোধেও নেওয়া হয় অতিরিক্ত ক্লাস। শিক্ষকদের এই বাড়তি প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভিভাবকদের সহযোগিতাও।
গ্রাম এলাকায় হলেও সন্তান নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাচ্ছে কি না, পড়াশোনা করছে কি না—এসব বিষয়ে নজর রাখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন অভিভাবকরা। আর এর সুফল পাচ্ছে শিক্ষার্থীরাই। নিয়মিত উপস্থিতি, সময়ানুবর্তিতা এবং শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা—এসব এখন বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন চিত্রের অংশ।
শিক্ষকরা জানিয়েছেন, শুধু পড়াশোনা নয়, শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সুযোগ পেলেই তারা অংশ নিচ্ছে খেলাধুলা ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমে। মাঠে খেলাধুলা আর শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা—দুই ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ যেন তাদের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই বিদ্যালয়ের সাফল্যের গল্পে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের মধ্যে তৈরি হয়েছে একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা। একদিকে শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা ও অতিরিক্ত পরিশ্রম, অন্যদিকে অভিভাবকদের সহযোগিতা। আর তার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, শৃঙ্খলা ও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ।
প্রধান শিক্ষক বশির আহমেদ বলেন, একটি বিদ্যালয়ের সাফল্য শুধু পরীক্ষার ভালো ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়। একটি বিদ্যালয়ের প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন সেখানে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত আসে, মনোযোগ দিয়ে শেখে, শৃঙ্খলা মেনে চলে এবং পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও অন্যান্য কার্যক্রমেও অংশ নেয়।
বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও সাবেক প্রধান শিক্ষক হাজী জয়নাল আবদিন জানান, এ বিদ্যালয়টি এ অঞ্চলের প্রায় সকল এলাকাবাসীর প্রিয় বিদ্যালয়।
তাই উত্তর চর পাগলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গল্পটি তাই শুধু একটি বিদ্যালয়ের সাফল্যের গল্প নয়। এটি দেখায়—সীমিত সুযোগের মধ্যেও শিক্ষকদের নিষ্ঠা, অভিভাবকদের সহযোগিতা, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি এবং শৃঙ্খলাবোধ একসঙ্গে থাকলে একটি প্রত্যন্ত গ্রামের বিদ্যালয়ও হয়ে উঠতে পারে সাফল্যের উদাহরণ। উত্তর চরপারগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়—গ্রামের মাটিতে গড়ে ওঠা সাফল্যের এমনই এক গল্প।



0Share