ইনতিয়াজ রাকিব : মেধা, অধ্যবসায় ও দায়িত্ববোধের সমন্বয়ে একজন মানুষ কীভাবে নিজের কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছাতে পারেন, তার একটি উদাহরণ ফরিদা খানম। রাজধানী ঢাকার প্রথম নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি দেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে বিশেষ স্থান করে নিয়েছেন। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন, শিক্ষাজীবন এবং মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যেও। তবে তাঁর সাফল্যের গল্প শুধু একটি পদে পৌঁছানোর নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে কাজ করার অভিজ্ঞতারও প্রতিফলন।
ফরিদা খানমের জন্ম ও বেড়ে ওঠা গোপালগঞ্জে। তাঁর বাবা প্রয়াত শিক্ষক মো. মতিউর রহমান জাফরিন এবং মা রিজিয়া বেগম। পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা ও মূল্যবোধ তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিক্ষাজীবনে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় সম্পন্ন করেন। ১৯৯২ সালে এসএসসি এবং ১৯৯৪ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) ২৫তম ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিয়ে সরকারি প্রশাসনে কর্মজীবন শুরু করেন ২০০৬ সালে।
প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ফরিদা খানম মাঠ প্রশাসনসহ সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন। দাগনভূঞা ও বেগমগঞ্জ উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ। উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি সেবা পরিচালনা, জনসাধারণের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পান তিনি। পরবর্তী সময়ে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরেও দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৪ সালে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি জেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন ফরিদা খানম। এরপর ২০২৬ সালের এপ্রিলে রাজধানী ঢাকার জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে ঢাকার ইতিহাসে প্রথম নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে তাঁর নাম যুক্ত হয়। জেলা প্রশাসকের দায়িত্বের সঙ্গে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবেও সংশ্লিষ্ট আইনগত ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। রাজধানীর জনসংখ্যা, নাগরিক সেবার চাহিদা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমের ব্যাপকতা বিবেচনায় এই পদে দায়িত্ব পালন একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
ঢাকার জেলা প্রশাসক হিসেবে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন, ভূমি-সংক্রান্ত প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং জনসাধারণের অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া তাঁর দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাজধানীতে নাগরিকদের নানা ধরনের প্রশাসনিক সেবা প্রয়োজন হয়। এসব সেবা সহজলভ্য করা এবং সরকারি দপ্তরের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যেকোনো জেলা প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ফরিদা খানমের কর্মজীবনের এই পথচলা প্রশাসনে নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের সরকারি প্রশাসনে নারীরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। রাজধানীর জেলা প্রশাসক হিসেবে একজন নারীর দায়িত্ব গ্রহণ সেই ধারাবাহিকতারই উল্লেখযোগ্য সংযোজন। তাঁর অভিজ্ঞতা ও দায়িত্ব পালনের ধরন ভবিষ্যতে নাগরিক সেবার মান উন্নয়নে কী ভূমিকা রাখে, তা পর্যবেক্ষণের বিষয়।
একজন সরকারি কর্মকর্তার সাফল্য শুধু পদমর্যাদায় নয়, বরং দায়িত্ব পালনের স্বচ্ছতা, জনসেবার মান এবং মানুষের আস্থা অর্জনের মধ্য দিয়েও মূল্যায়িত হয়। ফরিদা খানমের দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও নতুন দায়িত্বকে ঘিরে প্রত্যাশাও তাই নাগরিকসেবার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁর কর্মজীবনের গল্প তরুণ প্রজন্মের কাছে শিক্ষা, অধ্যবসায় ও পেশাগত নিষ্ঠার গুরুত্ব তুলে ধরতে পারে।



0Share