সানা উল্লাহ সানু : বাইরে থেকে দেখলে আর দশটি সাধারণ মসজিদের মতোই। নেই চোখধাঁধানো স্থাপত্য, নেই বিশাল কোনো মিনার। অথচ প্রতি শুক্রবার সকাল হলেই দূর-দূরান্তের হাজারো নারী-পুরুষ এখানে ছুটে আসেন এ মসজিদে। অনেকে বলেন মসজিদটি গরম।
তাই কেউ আসেন নামাজ পড়তে, কেউ দোয়া ও মিলাদে অংশ নিতে, আবার কেউ আসেন মসজিদটি একবার দেখতে। বে সবার হাতেই থাকে বিস্কুট, মিষ্টি, জিলাপি, আতর, গোলাপজল ও আগরবাতি।
কী এমন বিশেষত্ব রয়েছে লক্ষ্মীপুরের এই মসজিদে? কীভাবে প্রায় শত বছর ধরে মানুষের বিশ্বাস ও ভালোবাসার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে লক্ষ্মীপুর জেলার এ সাধারণ মসজিদটি?
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার লাহারকান্দি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের খাজুরতলী গ্রামের ঐতিহ্যবাহী মনুখা জামে মসজিদ ঘিরে রয়েছে এমনই এক ব্যতিক্রমী জনসমাগম ও লোকমুখে প্রচলিত ইতিহাস।
স্থানীয় অনেকেই মসজিদটিকে ‘মনখার মসজিদ’ নামে চিনলেও এর প্রকৃত নাম মনুখা জামে মসজিদ। স্থাপত্যের দিক থেকে মসজিদটি খুব একটা ব্যতিক্রমী নয়। তবে প্রায় একশ বছর ধরে প্রতি শুক্রবার এখানে বিপুল মানুষের সমাগম ঘটে। যা আশপাশের অন্যান্য মসজিদের তুলনায় একেবারেই আলাদা।
প্রতি শুক্রবার বিস্কুট-মিষ্টি-জিলাপির উপহার
শুক্রবার সকাল থেকেই মসজিদে আসতে শুরু করেন বিভিন্ন এলাকার নারী-পুরুষ। অনেকে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন বিস্কুট, মিষ্টি, জিলাপি, আগরবাতি, আতর ও গোলাপজল। এসব উপকরণ মসজিদে জমা রাখা হয় এবং পরে নামাজের পর দোয়া এবং দোয়ার পর মুসল্লিদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
সম্প্রতি সরেজমিনে মসজিদটিতে গিয়ে দেখা যায়, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের জন্য মসজিদের পাশে রয়েছে একটি ছোট কক্ষ। এর পাশেই রয়েছে অজুখানা। অজুখানার পাশে বিস্কুট ও মিষ্টি রাখার জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে অনেকগুলো ‘ওড়া’ বা টুকরি।
সকাল ১১টার দিকে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, একটি টুকরি বিস্কুটে পূর্ণ হয়ে গেছে। পরে দুপুর পৌনে ১টার দিকে আবার গিয়ে দেখা যায়, বিস্কুটে পূর্ণ হয়েছে প্রায় ১২টি টুকরি। পাশাপাশি জমা হয়েছে দুই টুকরি জিলাপি ও বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি। এসেছে বিপুল পরিমাণ আগরবাতি, গোলাপজল ও আতর।
প্রতি শুক্রবার এভাবেই মানুষের দেওয়া উপহার জমা হতে থাকে। পরে নামাজ ও দোয়া শেষে উপস্থিত মানুষের মধ্যে এসব খাবার বিতরণ করা হয়।
পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের জন্যও রয়েছে নামাজের ব্যবস্থা
মসজিদটিতে প্রতি শুক্রবার পুরুষ মুসল্লিরা জুমার নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে ইমাম ও মুসল্লিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় সম্মিলিত দোয়া ও মিলাদ মাহফিল।
অন্যদিকে, দূর-দূরান্ত থেকে আসা নারীদের জন্য মসজিদের দক্ষিণ পাশে তৈরি করা হয়েছে আলাদা একটি টিনশেড নামাজের ঘর। সেখানে বিপুলসংখ্যক নারী একসঙ্গে নামাজ আদায় করেন। তারা জুমার নামাজের পরিবর্তে যোহরের নামাজ আদায় করেন।
মসজিদ কমিটির সভাপতি আতাউর রহমান জানিয়েছে, নারীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকায় তাদের সুবিধার জন্য মসজিদের উত্তর পাশে অতিরিক্ত জায়গায় আরও একটি নারী মসজিদ নির্মাণ করা হচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে আগত নারীরা এক সাথে জুমার নামাজ আদায় করতে পারবে মনুখা মসজিদে।
প্রায় শত বছরের ইতিহাস, নির্মাতা কে ছিলেন মনুখা?
মসজিদ কমিটির সাবেক সভাপতি ইউছুফ আলী এবং স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা দুধা মিয়া জানায়, মসজিদটির বয়স আনুমানিক একশত বছরেরও বেশি হবে। তবে এর প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট সাল কিংবা পূর্ণাঙ্গ লিখিত ইতিহাস এখনো পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় দুধা মিয়া জানিয়েছেন তার নানা “মনুখা” এবং “আজীম উদ্দিন ঝাগিরদার” দুজন বন্ধু ছিলেন। সেই আজীম উদ্দিন ঝাগিরদার মসজিদের জন্য কিচু জমি দান করলে মনুখা সেখানে ছনপাতার একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। সময়ের পরিবর্তনে পর্যায়ক্রমে সেটি টিনশেড এবং পরে বর্তমান চেহারায় রূপ নেয়। নির্মাতা মনুখার নাম অনুসারেই মসজিদটির নাম হয়েছে মনুখা জামে মসজিদ। তবে নোয়াখাইল্লা আঞ্চলিক ভাষায় অনেকে বলে মনখার মসজিদ।
যেভাবে বিখ্যাত হয়ে উঠে
মসজিদটিকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে আরও একটি ঘটনা।
মসজিদ কমিটির সাবেক ও বর্তমান সভাপতি এবং স্থানীয় প্রবীণরা জানায়, ১৯৪৮ সালের দিকে এ অঞ্চলে একটি বড় ধরনের ঝড় আঘাত হানে। ঝড়ের পর আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় কলেরার প্রকোপ দেখা দেয়। তখন স্থানীয়রা কলেরা রোগের থেকে বাঁচার জন্য একজন হাফেজকে নিয়ে এসে এ মসজিদে একটি দোয়ার আয়োজন করেছিলেন। সে দোয়া অনুষ্ঠানের পর থেকে নতুন করে আর কোন ব্যক্তি কলেরায় আক্রান্ত হয়নি। অন্য দিকে কলেরা আক্রান্ত ব্যক্তিরা অল্প সময়ের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠে। ঘটনাটি মানুষের মধ্যে গভীর আবেগ ও বিশ্বাসের জন্ম দেয়। অনেকের ধারণা তৈরি হয়, এই মসজিদে এসে দোয়া করলে আল্লাহর কাছে তা কবুল হওয়ার আশা রয়েছে। সেই থেকে এ মসজিদে দোয়া শুরু হয়েছে আর কখনো বন্ধ হয়নি।
স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, ওই দোয়ার পরবর্তী সময়ে এলাকায় রোগের প্রকোপ কমে আসে।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে মসজিদটিতে প্রতি শুক্রবার দূর-দূরান্ত থেকে মানুষের আসা বাড়তে থাকে।
নিরুৎসাহিত করেও থামানো যাচ্ছে না মানুষের আগমন
মসজিদের খতিব মীম সোহাইল মাহমুদ জানায়, তারা আগত মুসল্লিদের অনেক সময় নিজ নিজ এলাকার মসজিদে নামাজ আদায় এবং সেখানে দোয়া ও মিলাদের আয়োজন করার পরামর্শ দেন। কারণ ইসলামে নিজ নিজ এলাকার মসজিদে জামাতে নামাজ আদায়ের গুরুত্ব রয়েছে।
তবুও মানুষের দীর্ঘদিনের আবেগ, ভালোবাসা ও বিশ্বাসের কারণে প্রতি শুক্রবার এখানে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটে। নিষেধ বা পরামর্শ সত্ত্বেও অনেকেই দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন।
মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শুক্রবারের অস্থায়ী বাজার
মনুখা জামে মসজিদকে কেন্দ্র করে প্রতি শুক্রবার আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠে ছোট ছোট দোকান। এসব দোকানে বিক্রি হয় বিস্কুট, মিষ্টি, জিলাপি, আতর, আগরবাতি ও বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি সামগ্রী।
এতে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি রিকশাচালক, পরিবহনশ্রমিক ও বিভিন্ন পেশার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। শুক্রবারকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকাতেই তৈরি হয় এক ধরনের ব্যস্ততা ও উৎসবমুখর পরিবেশ।
সাধারণ একটি মসজিদ, অসাধারণ মানুষের ভালোবাসা
বাংলাদেশে ঐতিহাসিক ও জনপ্রিয় মসজিদের কথা উঠলে কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদ কিংবা ঢাকার তারা মসজিদের নাম সামনে আসে। তবে লক্ষ্মীপুরের মনুখা জামে মসজিদের বিশেষত্ব এর স্থাপত্যে নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে মানুষের অংশগ্রহণ, আবেগ, সামাজিক যোগাযোগ ও স্থানীয় ঐতিহ্যের মধ্যে।
এখানে প্রতি শুক্রবার মানুষের আগমন, খাবার নিয়ে আসা, দোয়া ও মিলাদে অংশগ্রহণ এবং পরস্পরের মধ্যে খাবার বিতরণের যে চিত্র দেখা যায়, তা গ্রামীণ বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কৃতির একটি স্বতন্ত্র দৃষ্টান্ত।
প্রায় শত বছরের ঐতিহ্য বহন করা লক্ষ্মীপুরের সীমানা পেরিয়ে মনুখা জামে মসজিদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ছড়িয়ে পড়বে সারা দেশে।



0Share