সানা উল্লাহ সানু | একটি গাছ কি শুধুই একটি গাছ?
কাগজে-কলমে হয়তো তাই। কিন্তু কোনো কোনো গাছ একটি জনপদের কাছে গাছের চেয়েও অনেক বেশি কিছু। কোনো গাছ হয়ে ওঠে মানুষের স্মৃতি, শৈশব, ভালোবাসা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার তোরাবগঞ্জ বাজারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছটি তেমনই একটি গাছ।
স্থানীয়দের দাবি, গাছটির বয়স প্রায় একশ বছরের কাছাকাছি। তোরাবগঞ্জ বাজার প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৬ সালে। বাজার প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই গাছটি সেখানে ছিল বলে স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য। অর্থাৎ তোরাবগঞ্জ বাজারের দীর্ঘ পথচলার প্রায় পুরো ইতিহাসের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে এই কৃষ্ণচূড়া।
এই গাছের ছায়ায় কত প্রজন্ম দাঁড়িয়েছে, কত মানুষ পথ চলেছে, কত শিক্ষার্থী স্কুলে গেছে, কত ব্যবসায়ী দিনের শুরু করেছেন—তার হিসাব হয়তো কোনো খাতায় লেখা নেই। কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে সেই গল্পগুলো আজও বেঁচে আছে। গাছটি দেখেছে বাজারের পরিবর্তন, দেখেছে মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন, দেখেছে এই জনপদের আনন্দ-বেদনা, উৎসব-পার্বণ ও অসংখ্য ছোট-বড় ঘটনা।
তাই স্থানীয় মানুষের কাছে এটি নিছক একটি গাছ নয়। এটি তোরাবগঞ্জের একটি পরিচয়।
এই গাছটি রক্ষার জন্য অতীতেও একাধিকবার স্থানীয় মানুষকে দাঁড়াতে হয়েছে। বন বিভাগ কিংবা সড়ক বিভাগের পক্ষ থেকে গাছটি কাটার উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয়রা বাধা দিয়েছেন। নিজেদের স্মৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ মনে করে গাছটিকে রক্ষা করেছেন তারা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে গাছটি মানুষের সঙ্গে বেড়ে উঠেছে, সেটিকে এভাবে বারবার মৃত্যুর মুখোমুখি হতে দেখা সত্যিই বেদনাদায়ক।
এবারও সেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সড়কের দুই পাশে প্রায় তিন ফুট করে জায়গা বাড়ানোর পরিকল্পনার কারণে গাছটি কেটে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। কিন্তু তাদের প্রশ্ন গাছটি কি সত্যিই সড়ক সম্প্রসারণের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে?
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বাজারের ভেতরে সড়ক বিভাগের আগে থেকেই প্রায় তিন ফুটের মতো অতিরিক্ত জায়গা রয়েছে এবং কৃষ্ণচূড়া গাছটি সেই জায়গার বাইরে অবস্থান করছে। তাহলে সামান্য পরিকল্পনা ও কারিগরি সমন্বয়ের মাধ্যমে কি গাছটি রেখেই সড়ক উন্নয়ন করা সম্ভব নয়?
একটি গাছ কাটতে হয়তো কয়েক মিনিটই যথেষ্ট। কিন্তু একটি শতবর্ষী গাছ তৈরি হতে লাগে কয়েক দশক। আর একটি গাছের সঙ্গে মানুষের যে স্মৃতি তৈরি হয়, তা কোনো নতুন গাছ লাগিয়ে রাতারাতি ফিরিয়ে আনা যায় না।
উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। ভালো রাস্তা প্রয়োজন, নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু উন্নয়ন মানেই কি পুরোনো সবকিছু মুছে ফেলতে হবে? রাস্তা যদি মানুষের জন্য হয়, তাহলে সেই রাস্তার পাশে মানুষের ভালোবাসার একটি গাছকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টাও কি উন্নয়নের অংশ হতে পারে না?
আমরা এমন উন্নয়ন চাই, যেখানে নতুন রাস্তার পাশে পুরোনো কৃষ্ণচূড়াটিও দাঁড়িয়ে থাকবে, আর তার ছায়ায় দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারবে, এই গাছটি তাদের আগের বহু প্রজন্মের সঙ্গী ছিল।
তোরাবগঞ্জের এই কৃষ্ণচূড়া হয়তো কোনো স্থাপত্য নয়, কোনো স্মৃতিফলকও নয়। কিন্তু মানুষের ভালোবাসায় এটি একটি জীবন্ত স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে উঠেছে।
তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্থানীয় মানুষের দাবি গাছটি কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করা হোক। প্রকৌশলগতভাবে সম্ভব হলে সড়কের নকশায় সামান্য পরিবর্তন এনে গাছটিকে রক্ষা করা হোক। প্রয়োজন হলে গাছটির চারপাশে সুরক্ষাবেষ্টনী তৈরি করা হোক, সৌন্দর্যবর্ধন করা হোক, একটি ফলক বসিয়ে এর ইতিহাস সংরক্ষণ করা হোক।
কারণ একটি গাছ বাঁচানো মানে শুধু একটি গাছ বাঁচানো নয়।
এর সঙ্গে বেঁচে থাকে একটি বাজারের ইতিহাস, একটি জনপদের স্মৃতি, মানুষের আবেগ এবং কয়েক প্রজন্মের গল্প। তোরাবগঞ্জের কৃষ্ণচূড়াটি তাই কেবল রাস্তার পাশের একটি গাছ নয়, এটি তোরাবগঞ্জের জীবন্ত ইতিহাস।



0Share