বাংলাদেশ ষড়ঋতুর বা ছয়টির ঋতুর দেশ। বাংলা পঞ্জিকায় বারো মাস ছয়টি ঋতুতে বিভক্ত। অর্থাৎ দুই মাসে একটি ঋতু। বাংলা মাসগুলোর নাম বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন, ও চৈত্র। আর ঋতুগুলোর নাম গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। বাংলাদেশ ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে ভিন্ন ভিন্ন রূপে সাজে। কোন ঋতুতে বাংলাদেশের প্রকৃতি হয়ে ওঠে লাল, কোনো ঋতুতে সাদা রঙটি থাকে সবচে প্রকট আবার কোনো ঋতুতে পাকা শস্যের সোনালী রঙে সাজে বাংলাদেশের গ্রামগুলো।
| ইংরেজি মাস | বাংলা মাস | কৃষি ও অন্যান্য বিষয় | ||
| ০১ | এপ্রিল মাঝামাঝি – জুন মাঝামাঝি | বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ | খরা ও গরম থাকে। আউশ ধানের বীজ বোনা এবং পাট ও গ্রীষ্মকালীন সবজি (করলা, পটল, ঢেঁড়স) চাষের প্রস্তুতি চলে। আম, জাম, লিচু ও কাঁঠালের মৌসুম। | |
| ০২ | জুন মাঝামাঝি – আগস্ট মাঝামাঝি | আষাঢ়-শ্রাবণ | মুষলধারে বৃষ্টি হয়। আমন ধান রোপণ এবং পাট কাটার প্রধান মৌসুম। নদী-নালা ও খাল-বিলে প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যায়। | |
| ০৩ | আগস্ট মাঝামাঝি – অক্টোবর মাঝামাঝি | ভাদ্র-আশ্বিন | পরিষ্কার আকাশ ও তীব্র রোদ থাকে। আমন ধানের পরিচর্যা ও শেষ ধাপে ধান রোপণের কাজ চলে। শীতকালীন শাকসবজির বীজতলার প্রস্তুতি শুরু হয়। | |
| ০৪ | অক্টোবর মাঝামাঝি – ডিসেম্বর মাঝামাঝি | কার্তিক-অগ্রহায়ণ | শীতের আগমনী বার্তা ও মিষ্টি আবহাওয়া থাকে। অগ্রহায়ণ মাসে নতুন আমন ধান কাটা শুরু হয়। নতুন ধান ঘরে তোলার আনন্দে গ্রামীণ সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী ‘নবান্ন উৎসব’ উদযাপিত হয়। | |
| ০৫ | ডিসেম্বর মাঝামাঝি – ফেব্রুয়ারি মাঝামাঝি | পৌষ-মাঘ | তীব্র ও মাঝারি শীত অনুভূত হয়। গম, আলু, সরিষা ও বোরো ধানের চারা রোপণের ভরা মৌসুম। এছাড়া শীতকালীন নানা শাকসবজি (ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো) তোলার সময়। | |
| ০৬ | ফেব্রুয়ারি মাঝামাঝি – এপ্রিল মাঝামাঝি | ফাল্গুন-চৈত্র | আবহাওয়া মনোরম হতে থাকে। বোরো ধানের পরিচর্যা চলে এবং তীব্র গরমের আগে খরিপ-১ ফসলের আবাদ শুরু হয়। |
গ্রীষ্মকাল
গ্রীষ্ম ঋতুর সঙ্গে বাংলা পঞ্জিকায় বছর শুরু হয়। বৈশাখ বাংলা বছরের প্রথম মাস। বৈশাখ মাস শুরু হয় এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে। পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশীদের জন্য একটি উৎসবের দিন। এই দিনে নানান রকম দেশী খাদ্য তৈরি করে তারা। এরমধ্যে পান্তাভাত আর ইলিশ মাছভাজা খুব জনপ্রিয়। এই দিন বৈশাখী মেলা বসে বিভিন্ন স্থানে। বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মিলে গ্রীষ্ম ঋতু। গরমকালে বাংলাদেশের নদীনালায় পানি কমে যায়। ফলে নদীপথে যাতায়তও কমে যায়। সাধারণত এই ঋতুর শেষের দিকে বড় ঝড় হয়। এই ঝড়ের নাম কালবৈশাখী ঝড়। এই ঝড়ে বহু বাড়িঘর গাছপালা ধ্বংস হয়। অন্যদিকে, এই ঋতুতে অনেক সুমিষ্ট ফল পাওয়া যায়, যেমন আম, জাম, লিচু, কাঠাল ইত্যাদি।
বর্ষাকাল
আষাঢ় এবং শ্রাবণ মাসে মিলে বর্ষাকাল। আষাঢ় মাস শুরু হয় মধ্য জুনে। এই ঋতুতে মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। ফলে নদীনালা, খালবিল, পুকুর ইত্যাদি পানিতে ভরে ওঠে। বৃষ্টির পানি পেয়ে গাছপালা সতেজ হয়ে ওঠে। চারোদিক ছেয়ে যায় সবুজ রঙে। বৃষ্টির কারণে খুব বেশি বের হওয়া যায় না। ফলে ঘরের মধ্যে মানুষ নানা রকম সৃষ্টিশীল কাজ করে থাকে। যেমন, গ্রামের মেয়েরা এসময় নকশী কাঁথা বোনে। সেসব নকশী কাঁথা গ্রামবাংলার নানান চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়। বর্ষাকালে পথেঘাটে কদম ফুল ফুটে থাকে। তবে বর্ষাকাল অনেকের জন্য দুর্ভাগ্যও নিয়ে আসে। এসময় নদীগুলোর পাড় ভেঙে বহু লোকের ঘরবাড়ী নষ্ট হয়। বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা দেখা দেয়। বন্যা ফসল, রাস্তাঘাট নষ্ট হয়, নানারকম পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে।
শরৎ
শরৎ ঋতু শুরু হয় মধ্য আগস্টে। ভাদ্র ও আশ্বিন এই দুইমাস শরৎ কাল। শরৎকালে আকাশ বেশ পরিষ্কার থাকে। মাঝে মাঝে আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়। বিভিন্ন জলাশয়ে এই ঋতুর পরিচয়বাহী রঙ সাদা। পুকুরে আর খালে বিলে সাদা শাপলা, বাড়িতে বাড়িতে সাদা শিউলি ফুল, এবং নদীর পাড় ঘেঁষে ফোটা সাদা রঙের কাশফুল থাকে। শরতে তাল পাকে। শরতের সকালে ঘাসের উপর শিশির পড়ে। বাঙালি হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দূর্গাপুজা এসময়ে অনুষ্ঠিত হয়। এই ঋতুতে হিন্দুদের লক্ষী পূজা ও শ্যামা পূজাও অনুষ্ঠিত হয়।
হেমন্ত
হেমন্ত শুরু হয় মধ্য অক্টোবর থেকে। কার্তিক ও অগ্রহায়ণ এই দুইমাস মিলে হেমন্ত কাল। এই ঋতু নতুন ফসল ঘরে তোলার ঋতু। পাকা ফসলের সোনালী রঙে খেতগুলো ঝলমল করে। শুরু হয় ধান কাটার মওশুম। নতুন ফসল ঘরে তুলে কৃষকেরা নানান রকম মিষ্টান্ন তৈরি করে। এই ঋতুতে সবচেয়ে বড় উৎসব নবান্নের উৎসব। এই উৎসবে নতুন শস্যের খাদ্য তৈরি করে আত্মীয় স্বজনকে নিমন্ত্রণ করে এনে খাওয়ানো হয়। গ্রামে গ্রামে নবান্নের মেলা বসে। সেখানে দেশীয় নৃত্য, গান, লাঠিখেলাসহ নানারকম ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান দেখতে পাওয়া যায়। হেমন্ত ঋতুর শেষের দিকে আবহাওয়া ঠাণ্ডা হতে থাকে।
শীত
পৌষ ও মাঘ মাস নিয়ে শীতকাল। মধ্য ডিসেম্বরে শুরু হয় শীতকাল। শীত ঋতুতে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণ ঠাণ্ডা পড়ে। উত্তরাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ঠাণ্ডা পড়ে। এই ঋতুতে বাংলাদেশে বৃষ্টিপাত ঝড়বাদল ইত্যাদি হয় না। ফলে বেড়ানোর জন্য এই ঋতু আদর্শ। কিন্তু শীত কালের প্রকৃতি অত সবুজ সতেজ নয়। শীতকালে গাছের পাতা ঝরে যায়। চারদিকের প্রকৃতি ধূসর হয়ে হয়ে ওঠে। তবে এ সময় অনেক শাকসবজীর চাষ হয়, যেমন ফুল কপি, বাঁধা কপি, লাল শাক, পালং শাক, লাউ, মুলা এবং শিম ইত্যাদি। কোন কোন অঞ্চলে দিগন্ত জুড়ে সরিষার হলুদ ফুল দেখা যায়। সকালে এসব শাকসবজি আর ঘাসের উপর শিশির পড়ে। শীতের অন্যতম আকর্ষণ খেজুরের রস আর নানান রকম পিঠা। শীতে পিঠার উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। গ্রামেগঞ্জে রাত্রে যাত্রাপালা, পুতুলনাচ আর পালাগানের আসর বসে।
বসন্ত
ফাল্গুন ও চৈত্র মাস মিলে বসন্তকাল। বসন্তকাল শুরু হয় মধ্য জানুয়ারি মাসে। এই ঋতুতে প্রকৃতি আবার সজীব হয়ে ওঠে। গাছে গাছে নতুন পাতা গজায়। সবুজে ভরে ওঠে চারদিক। সেই সবুজের মাঝে লাল হলুদ রঙের ফুলের সমারোহ দেখা যায়।এই ঋতুতে ফোটে এমন ফুলের মধ্যের পলাশ, শিমুল এবং কৃষ্ণচূড়া অন্যতম। এভাবে নানান রঙের সমারোহে শীতের ধূসরতা দ্রুত দূর হয়ে যায়। পহেলা ফাল্গুনে বাংলাদেশীরা বসন্তবরণ উৎসব পালন করে। ছেলে মেয়ে সেদিন হলুদ রঙের পোশাক পরে বেড়াতে বের হয়। এই ঋতুতে হিন্দু ধর্মালম্বীরা পালন করে বাসন্তী পূজা এবং দোলযাত্রা। দোলযাত্রায় ছেলে মেয়েরা নানা রঙের আবির একে অপরের মুখমণ্ডলে মেখে আনন্দ করে। চৈত্র মাসে গরমের মাত্রা বেড়ে যায়। চারদিকের ফসলী জমি শুকিয়ে যায়। এই মাসের শেষ দিন বাঙালিরা চৈত্র সংক্রান্তি নাম উৎসব পালন করে।



0Share