সানা উল্লাহ সানু : ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে লক্ষ্মীপুরের পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অংশ নেওয়া ১৭ জন শিক্ষার্থীর কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এ নিয়ে গণমাধ্যমে নৈতিবাচক সংবাদ প্রকাশের পর জেলাজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব অবস্থা জানতে সরেজমিনে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাঁচটি প্রতিষ্ঠানই বেসরকারি ও এমপিওবিহীন। নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিনটি কলেজ এ বছরই নতুন প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রথমবারের মতো এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। বাকি দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্কুল শাখার পাশাপাশি কলেজ শাখা রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানপ্রধান, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব কলেজের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা, শ্রমজীবী এবং বিভিন্ন কারণে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে না পারা। কোথাও শিক্ষার্থীদের বাল্যবিবাহ, কোথাও কর্মসংস্থানের জন্য পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা রয়েছে। ফলে শ্রেণিকক্ষে অনিয়মিত উপস্থিতি ও পর্যাপ্ত পাঠগ্রহণের অভাব পরীক্ষার ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।
লক্ষ্মীপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার কুশাখালী ইউনিয়নের ফরাশগঞ্জ চর এলাকায় অবস্থিত বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মোমতাজ উদ্দিন আলোকিত কলেজ। ২০২২ সালে পাঠদানের অনুমতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানটির অন্তত ১০ কিলোমিটারের মধ্যে অন্য কোনো কলেজ নেই। এ বছর প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠানটি থেকে তিনজন নারী শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। তবে তিনজনই তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন।
কলেজের অধ্যক্ষ জানান, তিন পরীক্ষার্থীরই এসএসসি পাসের পর বিয়ে হয়ে যায়। এরপর নানা চেষ্টা করেও তাঁদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত রাখা সম্ভব হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ ও তরুণ উদ্যোক্তা আরিফ চৌধুরী শুভ বলেন, কলেজটিতে এলাকার সাতজন তরুণ শিক্ষক বিনা বেতনে পাঠদান করছেন। কিন্তু ফলাফল প্রকাশের পর প্রতিষ্ঠানের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা না করে নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ করায় তাঁরা হতাশ হয়েছেন। তাঁর মতে, অনগ্রসর চরাঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত কলেজটি এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
লক্ষ্মীপুর শহরের পুলিশ লাইনসে অবস্থিত পুলিশ লাইন স্কুল অ্যান্ড কলেজও নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত। কলেজ শাখার অনুমোদন পাওয়ার পর এ বছরই প্রতিষ্ঠানটি প্রথমবারের মতো এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। সোমবার প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে দেখা যায়, স্কুল শাখায় নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম চলছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও ছিল।
কলেজটির শিক্ষক মো. পারভেজ হোসেন জানান, বর্তমানে দ্বাদশ শ্রেণিতে ১৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তবে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তাদের একটি বড় অংশ অনিয়মিত হয়ে পড়ে। তাঁদের মধ্যে তিনজনের বিয়ে হয়েছে, একজন বিদেশে চলে গেছে এবং তিনজন বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়েছে। অন্যরাও নিয়মিত কলেজে আসে না।
তিনি আরও জানান, ২০২৬ সালে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা ১২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ছয়জনকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করানো সম্ভব হয়েছে। বাকি নয়জন বিয়ে ও কর্মসংস্থানের কারণে পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তবে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া তিনজনই নিয়মিত ক্লাস না করায় একটি করে বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে।
কমলনগরের ফজুমিয়ার হাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক আবদুস সহিদ বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের আটজন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাঁচজনই বিবাহিত। বাকি তিনজন শ্রমজীবী। এ কারণে কেউই নিয়মিত কলেজে উপস্থিত ছিল না। ফলে তারা সবাই পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে। তিনি জানান, স্কুলটির কলেজ শাখায় বর্তমানে মাত্র একজন শিক্ষক রয়েছেন।
অন্যদিকে, তোরাবগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজের কলেজ শাখা থেকে দুজন অনিয়মিত শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ইংরেজি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কামাল উদ্দিন আহমেদ জানান, ওই দুই শিক্ষার্থীই অনিয়মিত ছিল। ইতোমধ্যে তারা শ্রমিক হিসেবে কাজে যুক্ত হয়েছে।
স্বঅর্থায়নে পরিচালিত ক্যামব্রিজ সিটি কলেজের পরিচালক রানা চৌধুরী জানান, নতুন কলেজ হিসেবে এ বছর তাঁদের প্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। সে আইসিটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা সরকার থেকে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করি না। প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোসহ যাবতীয় ব্যয় নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হয়। বরং ফরম পূরণ, নিবন্ধনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে আমরা সরকারকে অর্থ প্রদান করি। আমাদের এই উদ্যোগকে উৎসাহিত করার পরিবর্তে শুধু ফলাফল বিপর্যয়ের খবর প্রকাশ করায় আমরা হতাশ হয়েছি।’
এদিকে, কলেজগুলোর কয়েকজন অভিভাবক সিরাজ, মো. হুমায়ূন কবির ও আবদুল ওয়াহেদ বলেন, নতুন এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত। এখানে সাধারণত ঝরে পড়া, তুলনামূলক কম মেধাসম্পন্ন, ভালো কলেজে ভর্তির সুযোগ না পাওয়া এবং শ্রমজীবী শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সুযোগ পায়।
তাঁদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের ফলাফলকে শুধু নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন না করে এর পেছনের বাস্তবতা ও সীমাবদ্ধতাগুলোও তুলে ধরা প্রয়োজন। পাশাপাশি অনগ্রসর এলাকার শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ ধরে রাখতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহযোগিতা করা উচিত।



0Share