ক্যাপ্টেন সাজ্জাদ চৌধুরী: আমার প্রথম ক্যাপ্টেন কমান্ড গ্রহণের মাত্র সাত দিনের মাথায় জাহাজকে পিরিয়ডিক্যাল রিপেয়ারের জন্য ড্রাই ডকে (Dry Docking) প্রবেশের প্রস্তুতি নিতে হয়। প্রস্তুতির সময় আমি লক্ষ্য করি, জাহাজের Slop Tank-এ প্রায় ২২০ মেট্রিক টন স্লপ জমা রয়েছে। এটি মূলত ট্যাংক ক্লিনিংয়ের ফলে সৃষ্ট তেল ও পানির মিশ্রণ, যা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের আওতায় যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা বাধ্যতামূলক। নিয়ম অনুযায়ী আমি বিষয়টি কোম্পানিকে রিপোর্ট করি এবং স্লপ ডিসপোজালের ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাই। কিছুক্ষণ পর ম্যানেজমেন্টের একজন কর্মকর্তা আমাকে ফোন করে নির্দেশ দেন, “এই ২২০ মেট্রিক টন স্লপ সাগরে ফেলে দাও।” আমি দৃঢ়ভাবে জবাব দিই, “এতে সমুদ্রের পানি দূষিত হবে। এ ধরনের কাজ আমার দ্বারা সম্ভব নয়।”
আমার ধারণা, প্রথমবারের মতো কমান্ডে থাকার সুযোগকে দুর্বলতা মনে করে তিনি আমাকে দিয়ে একটি অবৈধ কাজ করিয়ে কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেছিলেন। পরে তিনি সরাসরি চিফ অফিসারকে ফোন করেন। চিফ অফিসার বিষয়টি নিয়ে আমার অফিসে এসে অনুমতি চাইলে আমি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিই, “যতদিন এই জাহাজ আমার কমান্ডে থাকবে, ততদিন এ ধরনের কাজ করা যাবে না।” এরপর আমি জেনারেল ম্যানেজারকে ফোন করে বলি, “যদি আমাকে দিয়ে এই কাজ করাতে চান, তাহলে পরবর্তী বন্দরে আমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিন। কিন্তু পরিবেশ ধ্বংসের মতো কোনো কাজে আমি কখনো অংশ নেব না।”
আমার এই অবস্থানে ম্যানেজমেন্ট অসন্তুষ্ট হয়েছিল। পরবর্তীতে তারা স্বল্প সময়ের জন্য জাহাজকে অ্যাংকরে রেখে স্লপ ডিসচার্জের ব্যবস্থা করলেও আমি আমার সিদ্ধান্ত থেকে এক চুলও সরে আসিনি। হয়তো এতে আমার কিছু অর্থনৈতিক লাভ হতে পারত, কিন্তু আমি সেই প্রলোভনের কথা চিন্তাও করিনি। বরং আমি কোম্পানি, জাহাজের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং নিজেকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের দায় থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছি।
অনেক প্রতিকূলতা ও চাপের মধ্য দিয়েও শেষ পর্যন্ত আমি সম্মানের সঙ্গে চাকরি সম্পন্ন করেছি এবং মানসিক তৃপ্তি নিয়ে দেশে ফিরে এসেছি। এই অভিজ্ঞতা আমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
যখন এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ১.০৫ লক্ষ কোটি টাকা বের করে নেওয়ার অভিযোগ উঠল, তখন যাঁরা বিভিন্ন পর্যায়ে সেই ঋণ অনুমোদনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁদের ভূমিকা কী ছিল? তাঁরা কি দায়িত্ব এড়াতে পারেন? তাঁরা কি অনৈতিক নির্দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন? ঋণ অনুমোদনে আপত্তি জানিয়ে কোনো নথি সংরক্ষণ করেছিলেন? কিংবা প্রয়োজনে পদত্যাগের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস দেখিয়েছিলেন? আমরা যারা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে কাজ করি, তারা প্রায়ই নানা ধরনের অনৈতিক, অসৎ কিংবা বেআইনি নির্দেশের মুখোমুখি হই। কিন্তু একজন সৎ ও বিবেকবান মানুষ সেই নির্দেশকে প্রত্যাখ্যান করার সাহস রাখেন। এতে হয়তো চাকরি হারানোর ঝুঁকি থাকে, আর্থিক ক্ষতিও হতে পারে। কিন্তু জীবনের শেষ পর্যন্ত নিজের বিবেকের কাছে মাথা উঁচু করে বাঁচার যে তৃপ্তি, তার মূল্য কোনো অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। কারণ রিজিক মানুষের হাতে নয়, আল্লাহর হাতে।
লেখক: লক্ষ্মীপুর জেলার বাসিন্দা, এএফএনআই (ইউকে) ও মাস্টার মেরিনার, সিঙ্গাপুর ।



0Share