মাওলানা আব্দুল আজীজ বিন মালেক | বাংলাদেশে কওমি মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে জাতির ধর্মীয়, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের হাজার হাজার কওমি মাদরাসায় অধ্যয়নরত লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি সততা, নৈতিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, দেশপ্রেম এবং মানবসেবার আদর্শে গড়ে উঠছে।
এই শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষকবৃন্দ অত্যন্ত সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে জাতি গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করে চলেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা থেকে শুরু করে দেশের মসজিদ, মাদরাসা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক, মানবিক ও জাতীয় কর্মকাণ্ডে কওমি মাদরাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।
শুধু দেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলাদেশি আলেমগণ ইসলামী শিক্ষা, গবেষণা ও দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে দেশের সুনাম ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তাঁদের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ আজ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসলামী জ্ঞানচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করছে।
এত বৃহৎ জনগোষ্ঠী ও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাখাত জাতি গঠনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখলেও জাতীয় বাজেটে কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য কার্যকর ও পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাব পরিলক্ষিত হয়। অথচ শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণার প্রসার, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা এ খাতকে আরও সমৃদ্ধ ও কার্যকর করে তুলতে পারে।
আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, কওমি মাদরাসা রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চায় না; তবে রাষ্ট্রের অবহেলাও কাম্য নয়। আমরা বিশেষ কোনো ভর্তুকি বা অতিরিক্ত সুবিধা দাবি করছি না। আমাদের প্রত্যাশা কেবল এতটুকুই, স্বাস্থ্যসেবা, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের মতো জাতীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে কওমি শিক্ষার্থীরা যেন বঞ্চিত না হয়।
একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র কখনো তার নাগরিকদের শিক্ষার ধারার ভিত্তিতে বিভক্ত করে না। বরং প্রত্যেক নাগরিককে তার যোগ্যতা, দক্ষতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার সমান সুযোগ প্রদান করে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে কওমি শিক্ষার্থীদেরও জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতি ও সহায়তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
অতএব, সরকারের প্রতি আমাদের বিনীত আবেদন, দেশের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ, সুযোগ-সুবিধা এবং রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হোক। জাতি গঠনে অবদান রাখা এই বৃহৎ শিক্ষাখাতের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার ইতিবাচক ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এটাই দেশের কোটি মানুষের প্রত্যাশা।
জাতীয় বাজেটের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই প্রকাশ পাবে, যখন দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থী অনুভব করবে যে, এই রাষ্ট্র তাকে দেখছে, তাকে মূল্যায়ন করছে এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে গণ্য করছে। শেষ কথা হচ্ছে, জাতীয় সুযোগগুলো থেকে কওমি শিক্ষার্থীরা কেন বঞ্চিত ? এ দায় কার ?
মতামতের জন্য লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোর কিংবা এর সম্পাদকীয় নীতি দায়ে নয়। লেখা ও মতামত লেখকের নিজস্ব।
নিবন্ধটির লেখক: মাওলানা আব্দুল আজীজ বিন মালেক । শিক্ষক, জামিয়া তালিমুল ইসলাম (পাঁচপাড়া মাদরাসা), লক্ষ্মীপুর ।
লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থ সমূহ:
- হে উম্মাহ ফিরে এসো ইসলামের ছায়াতলে ,
- নারী পর্দাতেই সম্মানিতা
- হুজুরের প্রিয়তমা



0Share