মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন এ্যাডভোকেট | খুব আশার বাণী শুনিয়ে বিগত ২০২৫-২৬ কর বর্ষে সকল (কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছাড়া) করদাতার রিটার্ন জমা অনলাইনে চালু হয়। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে অনলাইন সিস্টেমটি চালু হয়েছিল ৪ আগস্ট ২০২৫ থেকে। অর্থাৎ কর বছর শুরু ১ মাস ৪ দিন পর। প্রথম বার সিস্টেম আপডেট করতে সময় লাগার কথা বলেছিলেন সেই সময়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সেটা মেনে নেয়া যায়, তখন ম্যানুয়াল রিটার্ন জমার ব্যবস্থাও ছিল।
চলতি কর বছর অর্থাৎ ২০২৬-২৭ কর বর্ষের জন্য এনবিআর এর বিদায়ী চেয়ারম্যান বেশ কিছু পরিবর্তনের কথা বলে আসছিলেন। আমরাও আশা করি পরিবর্তনগুলি দরকার এবং কার্যকরীভাবে দ্রুত দরকার। সময়ের সাথে সাথে চাহিদার আলোকে বাজেটের আকার যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, ঠিক একইভাবে রাজস্ব যোগানের চ্যালেঞ্জও বাড়ছে। এই চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবিলা করে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার অর্জন করতে না পারলে তার প্রভাব সরকারকে ঋণগ্রস্থ করতে বাধ্যকরে। রাজস্ব আদায় কাঙ্খিত মাত্রায় অর্জন না হলে, ঘাটতি তহবিলের জন্য সরকারকে দেশী-বিদেশী নানান উৎসের ঋণের উপর বেশি নির্ভর করতে হয়। এই ঋণের প্রভাবও বহু বছর ধরে স্থিতিশীল অর্থনীতির ক্ষেত্রে নেতিবাচক ভূমিকা রাখে। ফলে দেশের অর্থনীতি ক্রমাগত নিম্নমূখী হয়। যা আমাদের মত একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক বার্তা নয়।
২০২৬-২৭ অর্থ বছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল অংকের রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে কৌশলগত দিকটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এনবিআর নানানবিদ কৌশল নিয়েছে, নিশ্চয়ই। কৌশলগুলির মধ্যে অন্যতম হল ২০২৬-২৭ কর বর্ষে করদাতারা সারা বছর রিটার্ন দাখিল করতে পারবে। এই জন্য সারা বছরকে ৪টি প্রান্তিকএ ভাগ করেছে। ইতি মধ্যে এই প্রান্তিক ঘোষণা করা হয়েছে। যেমন-জুলাই- সেপ্টম্বর-১ম প্রান্তিক, অক্টোবর -ডিসেম্বর- ২য় প্রান্তিক, জানুয়ারী -মার্চ -তৃতীয় প্রান্তিক ও এপ্রিল-জুন -চতুর্থ প্রান্তিক।
এই ধাপগুলি সুবিধা দেখার জন্য পাঠক একটু নজর রাখতে পারেন নিচের ছকে:
|
ধাপ সমূহ |
করদাতার সুবিধা (%) ও জরিমানার অঙ্ক | কার্যকর সুবিধা/জরিমানা | সতর্কতার সাথে লক্ষ্য করুণ |
|
১ম প্রান্তিক জুলাই-সেপ্টেম্বর |
মোট কর দায়ের ৫% বা ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কর ছাড়। |
৫% বা ২৫ হাজার টাকার মধ্যে যে অঙ্কটি কম |
১ম প্রান্তিক এ রিটার্ন জমাদিন বাড়তি করছাড় নিতে পারেন। |
|
২য় প্রান্তিক অক্টোবর-ডিসেম্বর |
কোন প্রকার কর ছাড় নেই |
স্বাভাবিক যে কর দায় হয় করদাতাকে সেই পরিমাণ কর পরিশোধ করতে হবে |
কোন প্রকার জরিমানা ছাড়াই ২য় প্রান্তিক এ রিটার্ন জমা দিতে পারেন। |
|
৩য় প্রান্তিক জানুয়ারী-মার্চ |
মোট করদায়ের উপর ২% বা ৩ হাজার টাকা । এই দুই অঙ্কের মধ্য যে অঙ্কটি বড় সেই অঙ্কটি পরিশোধ করতে হবে। |
করদাতাকে কম পক্ষে ৩ হাজার টাকা অতিরিক্ত কর পরিশোধ করতে হবে। |
কমপক্ষে ৩ হাজার টাকা জরিমানাসহ রিটার্ন জমা দেয়ার সুযোগ রয়েছে। |
|
৩য় প্রান্তিক জানুয়ারী-মার্চ |
মোট করদায়ের উপর ৫% বা ৫ হাজার টাকা । এই দুই অঙ্কের মধ্য যে অঙ্কটি বড় সেই অঙ্কটি পরিশোধ করতে হবে। |
করদাতাকে কম পক্ষে ৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত কর পরিশোধ করতে হবে। |
কম পক্ষে ৫ হাজার টাকা জরিমানাসহ রিটার্ন জমার সযোগ রয়েছে। |
এই ৪ প্রান্তিকে কর ছাড়ের বিষয়টি যেমন আছে, তেমনি জরিমানার বিষয়ও আছে। করদাতাকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে তার নিজস্ব রিটার্ন দাখিল করার সময় নির্ধারণে। অর্থাৎ করদাতা নিজেই এখন রিটার্ন জমা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবেন, তিনি কোন ধাপে রিটার্ন দিবেন এবং বাড়তি করছাড়ের সুযোগ নিবেন, নাকি জরিমানা দিবেন। এই ক্ষেত্রে এনবিআর এক ধারুন কৌশল খাটিয়েছেন নিঃসন্দেহে!
আমরা যারা বাড়তি কর ছাড়ের চিন্তা করছি তারা ১ম ধাপে রিটার্ন জমা দিতে আগ্রহী হবো, এটাই স্বাভাবিক। এনবিআর ধরে নিয়েছে এর ফলে বছরের শুরুতে একটি উল্লেখযোগ্য করদাতা রিটার্ন দাখিল করার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠবেন এবং ব্যক্তি শ্রেণীর করদাতার কাছ থেকে লক্ষ্যমাত্রার একটি বড় অংশের রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হবে।
কিন্তু বিপত্তি হলো অন্য জায়গা! এনবিআর যত টুকু কৌশল নিয়েছে, তা কৌশলেই থেকে গেছে! বাস্তবায়নে তেমন কোনো কাজেই হাত দেয়নি। তার একটি বড় উদাহরণ হল -১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন কর বছরের রিটার্ন দাখিল করতে গিয়ে দেখা যায়, সিস্টেমকে হালনাগাদ করা হয়নি। আজ (১-৭-২০২৬ তারিখে)
আমার ইতালি প্রবাসীর একজন মক্কেল তার পরিবারের ২০২৬-২৭ কর বছরের ট্যাক্স ফাইল জমা দেয়ার জন্য চেম্বারে আসলেন। কিন্তু অনলাইন সিস্টেমে গিয়ে হতাশ হয়ে তাদের বিদায় দিতে হলো। অন-লাইন সিস্টেম এ ২০২৬-২৭ কর বছরের রিটার্ন জমা দেয়ার অপশন চালু হয়নি। তারা মন খারাপ করে চলে গেলেন।
অন্যদিকে আমি উপায় বের করার জন্য সরাসরি চলে গেলাম এনবিআর এর অন-লাইন রিটার্ন সংশ্লিষ্ট বিভাগে। সেখানে গিয়ে জানতে পারলাম “কমপক্ষে ১ থেকে দেড় মাস অপেক্ষা করতে হবে। কারণ যে পরিবর্তনগুলি আসছে, তা আপলোড করতে এই সময় লাগবে।” তাহলে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে এই বিলম্ব হওয়ার প্রকৃত কারণ কী? এতে এক বা দেড় মাস যে রিটার্ন গুলি জমা হওয়ার কথাছিল, তা বিলম্ব হলো। যে রাজস্ব আদায় হওয়ার কথা তাও বিলম্ব হলো, একটা অংশ হয়ত আর আদায় করাই সম্ভব হবে না। এর ফলে বছর শেষে মোট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এইভাবেই চলছে, বছরের পর বছর।
প্রকৃত পক্ষে রাজস্ব বিভাগের সিন্ধান্তগুলির ক্ষেত্রে কার্যকর দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রক্রিয়া সচল রাখতে হবে। অন্যান্য বিভাগের মত সিদ্ধান্তগুলি ফাইলবন্ধী থাকলে রাজস্ব বিভাগ ক্ষতির মুখে যেমন পড়বে, তেমনি পুরো রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় একটি নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হবে। এই বিষয়ে সরকারকে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থার প্রতি নজর দিতে হবে। মূলত সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই হবে রাজস্ব আদায়ের জন্য মূল চালিকা শক্তি।
এই সিস্টেমগত উন্নয়ন করতে খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন হয় না, দরকার প্লান, মনোযোগ, দায়িত্ববোধ ও সৃজনশীল মনোভাব ও নীতিগত সিদ্ধান্ত।
লেখক:
আইনজীবী -ঢাকা
republiclawchamber@gmail.com



0Share