মাওলানা আব্দুল আজীজ বিন মালেক | লক্ষ্মীপুরের জেলার বিভিন্ন গ্রামে ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়েছে মাদক। উদহারণ হিসেবে যদি বলি, তাহলে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার তেওয়ারিগঞ্জ ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি গ্রাম ও সমাজে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিদিন কোনো না কোনো পরিবার এই বিষাক্ত ছোবলে ধ্বংস হচ্ছে । সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের যুবসমাজ । যে যুবকদের হাতে বই থাকার কথা, কর্মসংস্থানের স্বপ্ন থাকার কথা, পরিবার ও সমাজ গঠনের দায়িত্ব নেওয়ার কথা—তাদের অনেকেই আজ মাদকের প্রভাবে জুয়া, চুরি-ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে ।
সম্প্রতি স্থানীয় আলেম মাওলানা আব্দুল গনি সাহেব এক লাইভ বক্তব্যে অভিযোগ করেন যে, নতুন তেওয়ারীগঞ্জের মত এত বড় বাজারের পাশে স্কুল ও আলীয়া মাদ্রাসার মাঠে ও ছাদে এবং বাজারের উত্তর গলির বিভিন্ন গোপনীয় আঙ্গিনায় মাদক সেবকদের মিলন মেলা হচ্ছে ।
যখন বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদকাসক্ত ও মাদক কারবারীদের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করছে, কঠোর সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, এমনকি জেদ করে কোথাও কোথাও গণপিটুনি দিয়ে প্রশাসনের হাতে তুলে দিচ্ছে, তখন আমার নিজের ইউনিয়নের বাসিন্দাদের এখন পরিস্থিতির মধ্যেও নীরব ভূমিকা আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করছে ।
শুক্রবার চর মটুয়া মাদ্রাসায় জামে মসজিদ কমপ্লেক্সে আনুষ্ঠানিকভাবে জুমার নামাজের পূর্ব মুহূর্তে হাজারো মুসল্লিদের সামনে জনাব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী সাহেব মাদ্রাসা ও মসজিদ সংক্রান্ত বক্তব্য প্রদানকালে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। একই সাথে তিনি মসজিদের ইমাম ও খতিব এবং ওলামায়ে কেরামদেরকেও মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান এবং মাদক নির্মূলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলেন । তাঁর এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আমি সাধুবাদ জানাই।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে এমন স্পষ্ট বার্তা দেওয়ার পরও আমাদের ইউনিয়নের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ কিংবা আমরা আলেম সমাজ সেই আহ্বান বাস্তবায়নে কী ভূমিকা রেখেছি ? মাদকের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ, সামাজিক প্রতিরোধ বা কার্যকর পদক্ষেপ কি আমরা দেখতে পেরেছি?
এই প্রশ্ন কোনো ব্যক্তি বা পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়; বরং আমাদের পুরো সমাজের স্বার্থেই । আমার আপনার ভাইদের কল্যাণের স্বার্থে । কারণ, মাদকের বিরুদ্ধে শুধু বক্তব্য নয়, মাঠে কার্যকর উদ্যোগই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। বাস্তবে যদি স্থানীয় পর্যায়ে সমাজের প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং ওলামায়ে কেরাম, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী_ সবার সমন্বয়ে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলন ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতো, তাহলে হয়তো ধীরে ধীরে মাদক নির্মূলে আমরা এগিয়ে যেতাম কিন্তু তা হচ্ছে না ।
আমার ব্যথিত হৃদয়ের প্রশ্ন , আমাদের সমাজের নেতৃত্বে থাকা স্থানীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ কি এই সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ নন? তারা শুধু দলীয় বিষয় জানিয়ে ব্যস্ত থাকলেই কি সমাজের দায়িত্ব শেষ? তাদের কি কোনো সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব নেই? যদি থাকে, তাহলে মাদকের মতো ভয়াবহ অভিশাপের বিরুদ্ধে আজও তাদের কার্যকর ও দৃশ্যমান ভূমিকা কোথায়? নাকি তাদের এই নীরব ভূমিকা ভিন্ন কিছু মনে করিয়ে দিচ্ছে? হ্যাঁ এই দীর্ঘ নীরবতা সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে কাউকে দোষারোপ করতে চাই না । তবে জনগণের এই প্রশ্নের জবাব কাজের মাধ্যমেই দেওয়া সমীচিন । মানুষ দেখতে চায়—মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলন ও পদক্ষেপ ,আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং তরুণদের রক্ষায় বাস্তব উদ্যোগ।
হ্যাঁ,একটি সমাজ শুধু রাস্তা, সেতু বা ভবন নির্মাণের মাধ্যমে উন্নত হয় না। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই হয়, যখন সেই সমাজের যুবসমাজ থেকে শুরু করে সকল শ্রেণীর মানুষ মাদক ও জুয়ামুক্ত, শিক্ষিত, নৈতিক, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আদর্শবান হিসেবে গড়ে ওঠে।
সবশেষে শুধু এতটুকুই বলতে চাই, আজ যদি আমরা নীরব থাকি, তাহলে সেই নীরবতার মূল্য দিতে হবে আমাদের আগামী প্রজন্মকে। এবং আগামীকাল হয়তো এই আগুন আমাদের নিজেদের ঘরেও পৌঁছে যাবে । তখন অনুতাপ ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।
তাই আসুন, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, উলামায়ে কেরাম ও সংশ্লিষ্ট সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে মাদকের বিরুদ্ধে সচেতন ও সোচ্চার হই। আসুন, দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিটি ইউনিয়নকে মাদকমুক্ত করার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করি। পাশাপাশি প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে কিভাবে কি করা যায়,সেটারও উদ্যোগ গ্রহণ করি।
মতামতের জন্য লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোর কিংবা এর সম্পাদকীয় নীতি দায়ে নয়। লেখা ও মতামত লেখকের নিজস্ব।
নিবন্ধটির লেখক: মাওলানা আব্দুল আজীজ বিন মালেক । শিক্ষক, জামিয়া তালিমুল ইসলাম (পাঁচপাড়া মাদরাসা), লক্ষ্মীপুর ।
আরো পড়ুন: জাতীয় সুযোগগুলো থেকে কওমি শিক্ষার্থীরা কেন বঞ্চিত ?
লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থ সমূহ:
- হে উম্মাহ ফিরে এসো ইসলামের ছায়াতলে ,
- নারী পর্দাতেই সম্মানিতা
- হুজুরের প্রিয়তমা



0Share