নিজস্ব প্রতিনিধি:লক্ষ্মীপুর জেলাব্যাপী কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, ভোট কেন্দ্রে হামলা, সংঘর্ষ- ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ককটেল বিষ্ফোরণের মধ্য দিয়ে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন শেষ হয়েছে। সকাল থেকেই আতংকের কারণে কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি দেখা যায়নি। সেনাবাহিনী, র্যাব, বিজিবিসহ আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী বিপুল সংখ্যক সদস্য ৪টি উপজেলায় নিরাপত্তার বলয় তৈরি করলেও ভোটার উপস্থিতি ছিল কম ।
এদিকে সোমবার ভোরে আ’লীগের সমর্থিত প্রার্থীর পোষ্টার নিয়ে কেন্দ্রে যাওয়ার সময় সদরের দিঘলী ইউনিয়নের উত্তর দূর্গাপুর গ্রামের কবির হোসেন দিপুকে (৩২) গুলি করে হত্যা করেছে দূর্বৃত্তরা। সে ওই ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের যুবলীগের সভাপতি। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে নেতাকর্মীদের মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
অন্যদিকে পেশাগত দায়িত্ব পালন কালে সাড়ে ১১টার দিকে মান্দারীতে আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে নাজেহাল হয়েছে লক্ষ্মীপুরের স্থানীয় ৪ সংবাদকর্মী। একই সময়ে রামগতির পূব চর মেহের সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র লক্ষ্মীপুরের ৬ সাংবাদিককে হামলা করে স্থানীয় বিএনপি কমীরা।
চন্দ্রগঞ্জের প্রতাপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে মিছিল নিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা হামলা চালায়। এসময় তারা ৩টি ব্যালট বাক্স ছিনিয়ে নেয় বলে জানিয়েছেন ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার ওলিয়ার রহমান। হাজিরপাড়া ইউনিয়নের চন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের নির্বাচনী সকল সরঞ্জাম পুড়িয়ে দেয় বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর লোকজন। এতে প্রশাসন ওই কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করে। এছাড়া দিঘলী ইউনিয়নের পশ্চিম জামিরতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নির্বাচনী সরঞ্জামে আগুন দিয়েছে বিএনপি কর্মীরা।
এদিকে আ’লীগ বিদ্রোহী প্রার্থী মহিউদ্দিন বকুল দুপুরে ভোট কেন্দ্র দখলের অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জন করেন।
রায়পুরের আ’লীগ সমর্থিত প্রার্থী আলতাফ হোসেনের লোকজন দক্ষিণ চরবংশী ও উত্তর চরবংশী, চর আবাবিল, উদমারা, সোনাপুর, বামনীসহ বেশ কয়েকটি স্থানে অন্তত ২০টি কেন্দ্র দখল করে নেয়। সকাল ১১টার মধ্যে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীদের এজেন্টদেরকে মারধর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়। সোমবার সকাল ১০ টায় দুইটি কেন্দ্রে দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে পুলিশ কনেসটেবল ১২ জন আহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রেন করতে না পারায প্রিজাইডিং অফিসার জাউডুগি ও গাইয়ারচর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করেন। সকাল ১১ টায় হায়দরগঞ্জ তাহেরিয়া আর এম ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে ২ প্রার্থীর সমর্থকদের মাঝে সংঘর্ষে ৯ জন আহত হয়। একই সময়ে কাজীরচর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসার একটি মহিলা বুথ বন্ধ করে দেন। জাল ভোটের অভিযোগে দক্ষিণ উদমারা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র সাময়িক ভাবে স্থগিত করলেও ২ ঘন্টা পরে তা আবার শুরু হয়। কাজিরদীঘির পাড় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ১০ টার মধ্যেই মাত্র ৪০টি ভোট গ্রহণ করা হয়।
সংঘর্ষে আহতরা হলেন পুলিশ কনসটেবল আবু হানিফ, যুবলীগ কর্মী আকতার হোসেন, নাদিম, কবির হোসেন, মোঃ শাহিন ও হুমায়ুন কবির সহ ১২ জন। পুলিশ কনসটেবলকে রায়পুর সরকারী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যরা স্থানীয় ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়েছেন।
এদিকে দুপুর ২টায় ভোট কারচুপি, কেন্দ্র দখল ও জাল ভোটের অভিযোগ এনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এড. মনিরুল ইসলাম হাওলাদার ভোট বর্জন করেছেন। আগের মত এবারের নির্বাচনের সহিংসতা ও কেন্দ্র দখলের ঘটনা ঘটেছে পৌরসভা ও ১০ ইউনিয়নে। ভোট শুরুর আগে বাক্স ভরে ভোট দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
বিএনপির সমর্থিত প্রার্থী এড. মনিরুল ইসলাম হওলাদার বলেন সকাল ৮ টা থেকে অধিকাংশ কেন্দ্রেই আ’লীগ সমর্থিত প্রার্থী মাস্টার আলতাফ হোসেন হাওলাদারের কর্মীসমর্থকেরা কেন্দ্র দখল করে ভোট কারচুপি, কেন্দ্র দখল ও জাল ভোট দিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী আলহাজ্ব হাবিবুর রহমান মিন্টু একই অভিযোগ করলেও তারা ভোট বর্জন করেননি।
রামগঞ্জে ভোটকেন্দ্র দখল ও জাল ভোট দেয়ার ছবি তুলতে গিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের হামলায় ২ সাংবাদিক আহত হয়েছেন। নয়নপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ইত্তেফাক স্থানীয় প্রতিনিধি জাকির হোসেন মোস্তান, ও মানবজমিন প্রতিনিধি আবু তাহের আহত হয়। আহতরা রামগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। আ’লীগ সমর্থিত প্রার্থীর আ ক ম রুহুল আমিনের লোকজন বিভিন্ন স্থানে কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট দেয়। এসময় অনেক ভোটার কেন্দ্রে এসে ভোট দিতে পারেন নি। প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব ও কেন্দ্র দখল করার অভিযোগ এনে দুপুর ১২ টার দিকে নির্বাচন বর্জন করেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী আবদুর রহিম।
রামগতিতে ব্যালট পেপারে অবৈধভাবে সীল মেরে নেয়ার ক্ষেত্রে যেন ঐক্য করেছে প্রার্থীরা। রামগতিতে ভোট শুরুর পর থেকে আ’লীগ সমর্থিত প্রার্থী আবদুল ওয়াহেদ, বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী আনোয়ার হোসেন, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী শরাফ উদ্দিন আজাদ সোহেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী আজাদ উদ্দিন চৌধুরী নিজের এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থীদের জোরপূর্বক কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়। এসময় প্রিজাইডিং অফিসারদেরকে জিম্মি করে প্রত্যেক প্রার্থী কর্মী সমর্থকদের নিয়ে ইচ্ছেমত নিজের প্রতীকে ভোট দেয়।
প্রসঙ্গত, লক্ষ্মীপুর জেলার ৪টি উপজেলায় ৯লাখ ২৭ হাজার ৩’শ ৫২ জন ভোটার রয়েছে। আ’লীগ, বিএনপি, জামায়াতের সমর্থন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে চেয়ারম্যান পদে ২১, ভাইস চেয়ারম্যান পদে ২২ ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ১৪জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন।



0Share