পাঠকের চিঠি | রোগী একজন নারী | তিনি লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোরে চিঠি দিয়ে যা জানিয়েছেন তা তুলে ধরা হলো:
গত বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) আমি কমলনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার জন্য যাই। কিন্তু সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, সেটা সত্যিই খুব হতাশাজনক।
হাসপাতালে গিয়ে প্রথমে চিকিৎসকের সিরিয়ালের জন্য দাঁড়াই। আমি স্পষ্টভাবে বলি যে ১২২ নম্বর কক্ষে, যেখানে দরজার ওপরে “মেডিসিন বিশেষজ্ঞ” লেখা রয়েছে, সেখানে ডাক্তার দেখাব। তখন সিরিয়াল নেওয়া ব্যক্তি আমাকে বলেন, “এটা সরকারি হাসপাতাল, এখানে কোনো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ থাকে না। বিশেষজ্ঞ আবার কী ?”
আমি তাকে বলি, “কিন্তু ১২২ নম্বর কক্ষের নিচেই তো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ লেখা আছে।” এরপর তিনি আমার বয়স জিজ্ঞেস করে একটি সিরিয়াল দেন। কিন্তু তার হাতের লেখা এতটাই অস্পষ্ট ছিল যে ১২২ নম্বরটি ১২৮-এর মতো দেখাচ্ছিল।
আমি বিষয়টি নিয়ে তখন কোনো কথা না বলে ১২২ নম্বর কক্ষের সামনে অপেক্ষা করতে থাকি। কিছুক্ষণ পর দেখি ১২২ নম্বর কক্ষে কোনো ডাক্তার নেই, পাশের কক্ষেও কোনো ডাক্তার নেই। সেখানে থাকা কর্মীদের জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন, ডাক্তার বাইরে গেছেন, ১০–১৫ মিনিটের মধ্যে আসবেন।
আমি অপেক্ষা করতে থাকি। কিন্তু ১০–১৫ মিনিট পার হওয়ার পরও ডাক্তার আসেননি।
এর মধ্যে সেখানকার একজন কর্মী সবার টিকিট দেখছিলেন। আমার টিকিট দেখে তিনি বলেন, এটা ১২৮ নম্বরের টিকিট। আমি তখন বলি, “আপনাদের কাউন্টারে যদি ১২২ এমনভাবে লেখা হয় যে সেটা ১২৮-এর মতো দেখায়, তাহলে সেটা তো আমার দোষ নয়।”
তারপর আমাকে আবার নতুন করে ১২২ নম্বর লিখিয়ে টিকিট ঠিক করতে বলা হয়।
আমি আবার সিরিয়াল নেওয়ার জায়গায় যাই। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি যে সিরিয়াল নেওয়ার কক্ষটি বন্ধ। সেখানে কেউ নেই। বাধ্য হয়ে অন্য জায়গায় গিয়ে সিরিয়াল ঠিক করার চেষ্টা করি। তখনও আমাকে খুব রূঢ়ভাবে বলা হয়, “এভাবে রুম নম্বর কাটাকাটি করার নিয়ম নেই।”
আমি বলি, “আমি তো বলছি নিয়ম নেই। কিন্তু আপনারা যদি এমনভাবে লিখেন যে ১২২ নম্বরটা ১২৮-এর মতো দেখায়, সেটা কি আমার দোষ?”
এরপরও আমাকে বিভিন্নভাবে কথা শোনানো হয়। এমনকি আমাকে বলা হয়, “মুখের ভিতর কথা রাখলে কীভাবে হবে? সুন্দর করে কথা বললে বুঝবে।” অথচ আমি শুরু থেকেই পরিষ্কারভাবে বলছিলাম যে আমি ১২২ নম্বর কক্ষেই ডাক্তার দেখাব।
একজন সাধারণ রোগী হিসেবে আমার প্রশ্ন—একটা টিকিটে হাতের লেখা অস্পষ্ট হওয়ার দায় কি রোগীর? আর সেই ভুল ঠিক করতে গিয়ে একজন রোগীকে বারবার এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরতে হবে এবং রূঢ় আচরণ সহ্য করতে হবে কেন?
এরপর অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর অবশেষে ডাক্তার আসেন। আমি লাইনে দাঁড়িয়ে ডাক্তার দেখাই। ডাক্তার কিছু পরীক্ষা দেন। পরীক্ষার জায়গায় কর্মীদের আচরণ কিন্তু ভালো ছিল—তারা সুন্দরভাবে পরীক্ষাগুলো করিয়ে দেন এবং প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্টও দিয়ে দেন। এই জায়গাটির জন্য তাদের ধন্যবাদ।
ডাক্তার আমাকে বলেন, রবিবার রিপোর্ট নিয়ে আবার আসতে।
আজ রবিবার, ১৬ আগস্ট। সকাল থেকেই প্রচণ্ড বৃষ্টি। তারপরও ডাক্তারের কথা অনুযায়ী অনেক কষ্ট করে হাসপাতালে যাই, যাতে রিপোর্টটা দেখাতে পারি। হাসপাতালে গিয়ে আবার ১২২ নম্বর কক্ষে রিপোর্ট দেখানোর জন্য সিরিয়াল চাইলে আমাকে বলা হয়, ডাক্তার কারও সঙ্গে কথা বলছেন, তাই এখন সিরিয়াল দেওয়া যাবে না। ডাক্তার কথা বলা শেষ করলে সিরিয়াল দেওয়া হবে।
এমনকি আমাকে বলা হয়, এখন যদি সিরিয়াল নিয়ে ডাক্তারের রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, তাহলে ডাক্তার রাগ করতে পারেন। তাই আমি ফিরে আসি এবং সিদ্ধান্ত নিই, ডাক্তার কথা বলা শেষ করলে আবার গিয়ে সিরিয়াল নেব।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার কথা বলা শেষ করলে আমি সিরিয়াল নেওয়ার জন্য যাই। কিন্তু তখন দেখি, ডাক্তার হাসপাতালের কয়েকজনের সঙ্গে বের হয়ে হাসপাতাল থেকেই চলে যাচ্ছেন। পরে দেখি প্রায় ১২:৪০ মিনিটের দিকে তিনি গাড়িতে উঠে হাসপাতাল থেকে চলে যান। ফলে আমি আজও রিপোর্ট দেখাতে পারলাম না।
এখন আমার প্রশ্নগুলো হলো:
১. সরকারি হাসপাতালে একজন চিকিৎসকের নির্ধারিত OPD duty hour আসলে কতটা থেকে কতটা?
২. চিকিৎসক যদি duty hour-এর মধ্যে কোনো কারণে রোগী দেখা বন্ধ করে হাসপাতাল থেকে চলে যান, তাহলে অপেক্ষমাণ রোগীদের কি জানানো উচিত নয়?
৩. একজন রোগীকে যদি বলা হয়, “ডাক্তার কথা বলা শেষ করলে সিরিয়াল দেওয়া হবে”—তাহলে ডাক্তার কথা বলা শেষ করার পর যদি তিনি হাসপাতাল থেকেই চলে যান, তাহলে সেই রোগী দায়ভার কার কাছে নেবে?
৪. বৃহস্পতিবার দীর্ঘ সময় ডাক্তারকে না পেয়ে অপেক্ষা করতে হয়েছে, আর আজ রবিবারও ডাক্তারের রিপোর্ট দেখানোর জন্য প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে হাসপাতালে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ডাক্তারকে না দেখিয়েই ফিরে আসতে হয়েছে। তাহলে একজন সাধারণ মানুষ চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে এসে আসলে কোথায় যাবে?
আমি কোনো চিকিৎসককে ব্যক্তিগতভাবে অপমান বা হেয় করতে চাই না। আমি শুধু জানতে চাই—সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষের সময়, কষ্ট এবং ভোগান্তির কি কোনো মূল্য নেই?
একজন রোগী বৃষ্টি মাথায় করে, সময় ও টাকা খরচ করে, শারীরিক কষ্ট নিয়েও হাসপাতালে আসে। সে যদি শেষ পর্যন্ত ডাক্তারকে না দেখিয়েই ফিরে যায়, তাহলে এই ব্যবস্থার জবাবদিহিতা কার কাছে?
আর সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো—চিকিৎসা নিতে গিয়ে সমস্যার চেয়েও বেশি কষ্ট পেয়েছি কিছু কর্মীর রূঢ় ও অসম্মানজনক আচরণে।
হাসপাতালের পরিবেশ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, অপেক্ষমাণ রোগীদের বসার ব্যবস্থা, ফ্যানের ব্যবস্থা—এসব নিয়েও অনেক কিছু বলার আছে। কিন্তু সেসব বাদই দিলাম।
আমি শুধু চাই, এই বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসুক এবং একজন সাধারণ রোগী যেন ভবিষ্যতে এভাবে হয়রানির শিকার না হন।
বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি:
👉 মাননীয় সংসদীয় হুইপ ও লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের মাননীয় এমপি এ.বি.এম. আশরাফ উদ্দিন (নিজান)
👉 মাননীয় পানিসম্পদমন্ত্রী ও লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের মাননীয় এমপি শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি
👉 কমলনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ঊর্ধ্বতন স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের
অনুরোধ করছি, বিষয়টি একটু গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন।
আমরা সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাই কারণ সেখানে আমাদের অধিকার অনুযায়ী চিকিৎসাসেবা পাওয়ার আশা করি। আমরা কারও কাছে বিশেষ সুবিধা চাই না—শুধু চাই নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসা, সঠিক তথ্য এবং একজন রোগীর সঙ্গে ন্যূনতম সম্মানজনক আচরণ। আমি একজন রোগী হিসেবে আমার নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছি এবং জানতে চাই—এই ঘটনার দায় কার?
আশা করি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি দেখবেন এবং ভবিষ্যতে সাধারণ রোগীদের এমন ভোগান্তির শিকার হতে হবে না।



0Share