ক্যাপ্টেন সাজ্জাদ চৌধুরী: বর্তমান সড়ক দুর্ঘটনাগুলোর সুক্ষ্ম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার উপস্থিতি প্রায় প্রতিটি ঘটনার সাথেই জড়িয়ে আছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কগুলোতেও এখন অটোরিকশার বিপজ্জনক রেসিং চোখ পড়ে।
নির্দিষ্ট লেন অমান্য করা কিংবা হুট করে উল্টো লেনে উঠে পড়ার মতো দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ কেবল ট্রাফিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘনই নয়, বরং যাত্রী ও পথচারীদের জীবনের জন্য এক মারাত্মক হুমকি। জুলাই ২০২৪ পরবর্তী সময়ে অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির কারণ সাম্প্রতিক সময়ে অটোরিকশার অপ্রতিরোধ্য দাপট বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু বহুমাত্রিক কারণ কাজ করছে:
আইন প্রয়োগের শিথিলতা: রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ট্রাফিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও নজরদারি সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাব: অনিয়ন্ত্রিতভাবে অটোরিকশা চলাচলের পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অপ্রকাশ্য ভূমিকা রয়েছে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও চাহিদা: অর্থনৈতিক চাপে সাধারণ মানুষ অপেক্ষাকৃত সস্তা ও দ্রুতগতির যান হিসেবে অটোরিকশাকে বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
আরো পড়ুন: বাংলাদেশে ব্যাংকিং সেক্টরের নেতৃত্বে সততা কোথায়?
সুনির্দিষ্ট নগর পরিকল্পনার অভাব: গণপরিবহন ব্যবস্থার চরম সংকট ও বিকল্প ব্যবস্থার ঘাটতি থাকায় অটোরিকশা খুব সহজেই এই শূন্যস্থান পূরণ করে ফেলেছে। (উল্লেখ্য, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সঠিক নীতি নির্ধারণের জন্য এগুলো সম্ভাব্য পর্যবেক্ষণ হলেও সরকারি নিরপেক্ষ তথ্য ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।)
সাময়িক সুবিধা বনাম নাগরিক নৈতিকতার সংকট অটোরিকশা স্থানীয় পর্যায়ে যাতায়াতের ক্ষেত্রে কিছু তাৎক্ষণিক সুবিধা দিচ্ছে, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সামান্য সুবিধার বিনিময়ে আমরা কি পুরো শহরের পরিবহন ব্যবস্থাকে এক চিরস্থায়ী বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিচ্ছি না?
এখানে আমাদের দ্বিমুখী নাগরিক মানসিকতার এক স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়: আমরা প্রায়ই বলি “আমি দুর্নীতি করি না”, কিন্তু সুবিধাজনক সুযোগ পেলে তা গ্রহণ করতে দ্বিধা করি না। ঠিক একইভাবে, আমরা সবাই দেশের সুশাসন ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে চাই, কিন্তু নিজের ব্যক্তিগত সুবিধার ক্ষেত্রে চরম অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলাকে নীরবে সমর্থন জোগাই। এই ব্যক্তিগত নৈতিকতার সংকটই আজকের জাতীয় দূরবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে। সঙ্কট উত্তরণে কার্যকরী পদক্ষেপ।
কঠোর আইন প্রয়োগ: জাতীয় মহাসড়ক ও প্রধান প্রধান মূল সড়কে অটোরিকশা চলাচল শতভাগ নিষিদ্ধ করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ। * প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধন: চালকদের ড্রাইভিং নিয়মাবলী ও সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণের আওতায় আনা।
বিকল্প গণপরিবহন: পরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল নগর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলে যাত্রী ভোগান্তি কমানো।
রাজনৈতিক সদিচ্ছা: দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে নগর সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা। ঢাকাসহ সারাদেশের সড়কে অটোরিকশার এমন অনিয়ন্ত্রিত চলাচল কেবল একটি সাধারণ পরিবহন সংকট নয়;
এটি আমাদের প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং নাগরিক নৈতিকতার সার্বিক ক্ষয়িষ্ণু রূপ। সাময়িক স্বাচ্ছন্দ্য নয়, বরং সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত আমাদের মূল লক্ষ্য।
লেখক: লক্ষ্মীপুর জেলার বাসিন্দা, এএফএনআই (ইউকে) ও মাস্টার মেরিনার, সিঙ্গাপুর ।



0Share