সব কিছু
লক্ষ্মীপুর বৃহস্পতিবার , ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
লক্ষ্মীপুর প্যাকেজিং শিল্পে ২৫শ নারী যুক্ত – Lakshmipur24

লক্ষ্মীপুর প্যাকেজিং শিল্পে ২৫শ নারী যুক্ত

লক্ষ্মীপুর প্যাকেজিং শিল্পে ২৫শ নারী যুক্ত

সানা উল্লাহ সানু: লক্ষ্মীপুর জেলায় ছোট বড় মিলে হাটবাজার রয়েছে ১ শত ৮৩টি। এ সকল হাটবাজারের মিষ্টির দোকান, রেষ্টুরেন্ট, ফলের দোকান, কনফেকশনারী এবং জুতার দোকানের মতো নির্দিষ্ট কিছু দোকানে পণ্য বিক্রিতে প্রতিমাসে কয়েক কোটি কাগজের তৈরি প্যাকেট (ঠোঙ্গা) ও ছোট কার্টনের চাহিদা রয়েছে।

চাহিদার প্রায় দুই কোটি প্যাকেট(ঠোঙ্গা) ও এক কোটি কার্টন স্থানীয়ভাবে তৈরি করা হয়। এ প্যাকেজিং ব্যবসায় কর্মসংস্থান হয়েছে কমপক্ষে দুই হাজার নারী পুরুষের। যাদের প্রত্যেকের মাসিক আয় সর্বনিম্ন দশ হাজার টাকার বেশি। পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষায়ও বিশেষ অবদান রাখছে এ প্যাকেজিং শিল্প।

চলতি সপ্তাহে লক্ষ্মীপুরের প্যাকেজিং শিল্পের কয়েকটি স্থানে গিয়ে এর সাথে জড়িত কয়েকজন কারিগর, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী এবং প্যাকেট গ্রাহক দোকানদারদের সাথে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে। প্যাকেজিংয়ের সাথে জড়িত সবারই দাবি সরকারি বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আরো বহু লোকের কর্মসংস্থান হতে পারে এ ব্যবসায়।
একই সময়ে পরিবেশকর্মীদের দাবি কাগজের প্যাকেটের ব্যবহার বৃদ্ধিতে পরিবেশের যেমন সুরক্ষা হবে তেমনি ব্যবহৃত কাগজের পুনরায় ব্যবহারের মাধ্যমে
তা থেকে আয়ও সম্ভব।

পুরাতন কাগজের তৈরি প্যাকেটকে লক্ষ্মীপুরের স্থানীয় ভাষায় ‘ঠোঙ্গা’ বলা হয়। এসব ঠোঙ্গা ফল দোকান, কনফেকশনারী ও মুদি দোকানে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে নতুন কাগজ ও হার্ডবোর্ডের তৈরি চার কোণার প্যাকেটকে ‘কার্টন’ বলা হয়। মিষ্টির দোকান, রেষ্টুরেন্ট, কনফেকশনারী এবং জুতার দোকানে কার্টন ব্যবহৃত হয়। কিছু পণ্য বিক্রিতে আগে পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার হলেও বর্তমানে এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে কাগজের ব্যাগ (ঠোঙ্গা) এবং কার্টন।

লক্ষ্মীপুর জেলা  শহরের ৪ ও ৫ নং ওয়ার্ড শাখাঁরীপাড়া। এ দুই ওয়ার্ডে অধিবাসী পরিবারের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার। মাত্র ২০-৩০টি পরিবার ছাড়া প্রতিটি গরিব আর মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরা ঠোঙ্গা প্যাকেট তৈরি শিল্পের সাথে সরাসরি জড়িত।

গৃহবধূ চিনু রানী শুর, অনু রাণী শুর, সীমা কর এবং জোৎস্না রাণী নন্দি জানান, তাদের এলাকায় কমপক্ষে ১১শ জন নারী ঠোঙ্গা প্যাকেট তৈরি করে। গৃহবধূ চিনু রানী শুর ও  অনু রাণী শুর আরো জানান, প্রত্যেক নারী প্রতি মাসে কমপক্ষে সর্বনিম্ন ১০ হাজার ঠোঙ্গা প্যাকেট তৈরি করতে পারে।

প্যাকেট ব্যবসায়ী শ্যামল মজুমদার জানান, জেলার শুধু শাঁখারীপাড়া থেকে মাসে কমপক্ষে প্রায় দেড় কোটি প্যাকেট তৈরি ও বিক্রি হয়। সীমা কর জানান, এখানকার অনেক পরিবার শুধু নারীদের আয়েই চলে। প্রতি কেজিতে ২৯-৩০টি প্যাকেট থাকে যার প্রতি কেজি ৩৫-৪০ দামে বিক্রি হয়।

অন্যদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলার রায়পুরের পৌর শহরের পালপাড়া, রামগঞ্জে শ্রীরামপুর, কমলনগরের করুণানগর, রামগতির আশ্রম এবং রামগতি বাজার এলাকায় আরো প্রায় এক হাজার পরিবার এ প্যাকেজিং শিল্পের সাথে জড়িত আছে। তাদের হাতেও তৈরি হয় মাসে কমপক্ষে ৭০-৮০ লাখ প্যাকেট।

লক্ষণ দত্ত নামের এক উদ্যোক্তা জানান, তারা ঠোঙ্গা নামের যে প্যাকেট তারা তৈরি করেন সেগুলো মূলত পুরাতন পত্রিকার কাগজ, বই, খাতা ইত্যাদি দিয়ে তৈরি হয়। তিনি আরো জানান, এর বাহিরে নতুন কাগজে তৈরি হয় খাম। আমের মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ঠোঙ্গার চাহিদা থাকে। আর বর্ষা মৌসুম হচ্ছে ঠোঙ্গা তৈরির জন্য খারাপ সময়।

প্যাকেজিং শিল্পের অন্য আরেক সংস্করণের নাম কার্টন। কার্টন তৈরিতে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে কমপক্ষে ৫শ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে।

কার্টন প্যাকেজিং শিল্পের মাধ্যমে নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন, এমন যুবক মাহফুজ আলমের সাথে কথা হয় লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দালালবাজার ইউনিয়নে।

তিনি জানান, অর্থাভাবে বেশিদূর পড়াশোনা করতে না পারায়  এলাকায় গড়ে তোলেন “মাহফুজ প্যাকেজিং”। মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানে তিনি এখন ৩টি কারখানার মালিক। দালালবাজার, লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর তেমুহনী ও শহরের মাদাম জিরো পয়েন্টে তার কারখানা রয়েছে।  বর্তমানে তার এসব প্রতিষ্ঠানে কারিগরসহ ১২ জন কর্মচারী কাজ করেন।

মাহফুজ সদর উপজেলার দালালবাজার এলাকার স্কুল শিক্ষক মাওলানা নুরুজ্জামান মাষ্টারের ছেলে। আগে তিনি শুধু সাদা কার্টন বানালেও বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামেও কার্টন বানানোর কাজ শুরু করেন।

রামগঞ্জের জননী কার্টনের মালিক ইউছুপ জানান, মিষ্টির কার্টন তৈরিতে মিল্লাত বোর্ড, সাইজিং কাগজ ও কৃষ্ণা বোর্ড ঢাকা থেকে আনেন তারা। ভালো মানের একশত কার্টন তৈরিতে দুই থেকে তিন ঘন্টা সময় লাগে। প্রতি পিস প্যাকেট বিক্রি হয় পাঁচ থেকে দশ টাকায়। এক একটি প্রতিষ্ঠান মাসে তিনি ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কার্টন তৈরি করতে পারে।

করোনা মহামারির প্রথম দিকে এ শিল্পের অবস্থা একটু খারাপ থাকলেও বর্তমানে তাদের ব্যবসা আবার চাঙ্গা হতে শুরু করেছে বলেও জানান তিনি।

এ প্রতিবেদন তৈরিতে লক্ষ্মীপুর জেলা শহরের ২টি মিষ্টির দোকান, ৩টি ফলের দোকান, ১টি রেষ্টুরেন্ট, ২টি জুতার দোকান এবং ১জন জুতা বিক্রেতার সাথে কথা হয়।

ঐসকল দোকানের বিক্রেতারা জানান, তারা র‌্যাক্সিন এবং পলিথিন ব্যবহারের পাশাপাশি কাগজের তৈরি প্যাকেট বা মোড়ক ব্যবহার করেন। প্রতি দোকানদার কমপক্ষে দৈনিক দেড়শ থেকে দুইশ কাগজের প্যাকেট ব্যবহার করেন।

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দত্তপাড়া এলাকার শ্রী কৃষ্ণ মিষ্টি ভান্ডার ব্যবসায়ী লোকনাথ জানান, প্রতি মাসে তিনি দোকানে প্রায় তিন হাজার প্যাকেট ব্যবহার করেন। যেগুলো স্থানীয়ভাবে ক্রয় করেন।

কমলনগরের মদিনা ফল বিতানের মালিক কাউছার জানান, তিনি প্রতিমাসে ১০ হাজার কাগজের ব্যাগ ক্রয় করেন এবং আমের মৌসুমে মাসে ৩০ হাজার প্যাকেটও ক্রয় করেন।

রাজধানী রেষ্টুরেন্টের মালিক মো: ছিদ্দিক জানান, রেষ্টুরেন্ট শিল্প কার্টন ও প্যাকেট (ঠোঙ্গা) ব্যবহার ছাড়া অচল। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের পণ্যসামগ্রী বাজারজাত এবং আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করার জন্যও বিভিন্ন ধরনের প্যাকেট ব্যবহৃত হয়।

স্টুডেন্ট লাইব্রেরির মালিক আবদুল মালেক জানান, পণ্য প্যাকেজিং ছাড়াও খামে করে অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্কুল-কলেজের জরুরি কাগজপত্র ও চিঠিপত্র পাঠানো হয়। এছাড়া বিভিন্ন দিবস ও অনুষ্ঠানের দাওয়াতপত্র ও শুভেচ্ছা কার্ড বিভিন্ন রকম খামে ভরে পাঠানো হয়। এসকল খামও স্থানীয়ভাবে তৈরি হয়।

পরিবেশবাদী সংগঠন সবুজ বাংলাদেশ এর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মোঃ ইসমাইল হোসেন সবুজ বলেন, পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার সরকারিভাবে নিষিদ্ধ। কিন্ত এরপরেও নানা কৌশলে পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার বন্ধ করা যায়নি। পরিবেশ সুরক্ষার জন্য পলিথিন ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করার জন্য কাগজের প্যাকেট ও কার্টন ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। লক্ষ্মীপুরে এমন একটি পরিবেশ বান্ধব শিল্পের  প্রসারে তিনি সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন।

Author

স্পেশাল স্টোরি আরও সংবাদ

লক্ষ্মীপুর প্যাকেজিং শিল্পে ২৫শ নারী যুক্ত

খাল সংস্কার না হওয়ায় জলমগ্ন হচ্ছে রামগতি বাজার

৪১ হাজার মানুষের জন্য নেই একটিও আশ্রয় কেন্দ্র

লক্ষ্মীপুরে স্বর্ণের দোকানে ঝুঁকিপূর্ণ এসিড ব্যবহার, হুমকির মুখে জনস্বাস্থ্য

লক্ষ্মীপুরটোয়েন্টিফোর বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ে নিবন্ধনকৃত নিউজপোর্টাল  
 All Rights Reserved : Lakshmipur24 ©2012-2026
Chief Mentor: Rafiqul Islam Montu, Editor & Publisher: Sana Ullah Sanu.
Muktijudda Market (3rd Floor), ChakBazar, Lakshmipur, Bangladesh.
Ph:+8801794 822222, WhatsApp , email: news@lakshmipur24.com