ইতিহাস ও পরিচিতি
রামগঞ্জের নামকরণ ও প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নিয়ে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামল থেকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীতে উপজেলা প্রশাসনিক কাঠামো গঠনের মাধ্যমে রামগঞ্জ জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনপদে পরিণত হয়। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, শিক্ষা বিস্তার এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় এ অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে।
ভৌগোলিক অবস্থান
লক্ষ্মীপুর জেলা সদর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রামগঞ্জ উপজেলার আয়তন ১৬৯.৩১ বর্গকিলোমিটার। উপজেলার উত্তরে চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ, হাজীগঞ্জ ও শাহরাস্তি উপজেলা, পূর্বে শাহরাস্তি ও নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলা, পশ্চিমে ফরিদগঞ্জ ও রায়পুর উপজেলা এবং দক্ষিণে লক্ষ্মীপুর সদর ও রায়পুর উপজেলা অবস্থিত।প্রশাসনিকভাবে উপজেলাটি ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। পৌরসভায় রয়েছে ৯টি ওয়ার্ড ও ১৮টি মহল্লা। এছাড়া পুরো উপজেলায় ১৪৫টি গ্রাম এবং ১৩২টি মৌজা রয়েছে।
তিন লাখের বেশি মানুষের আবাস
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী রামগঞ্জ উপজেলার মোট জনসংখ্যা ৩ লাখ ১৩ হাজার ২১৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৪০ হাজার ৩৩৩ জন এবং নারী ১ লাখ ৭২ হাজার ৮৭৬ জন। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ১ হাজার ৮৫০ জন, যা দেশের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম।ধর্মীয় দিক থেকে উপজেলার প্রায় ৯৬.৫৪ শতাংশ মানুষ মুসলিম এবং প্রায় ৩.৪৫ শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী।
শিক্ষায় জেলার শীর্ষে
শিক্ষার ক্ষেত্রে রামগঞ্জ উপজেলার অবস্থান লক্ষ্মীপুর জেলার মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে। উপজেলার সাক্ষরতার হার ৮২.৯ শতাংশ, যা জেলার সর্বোচ্চ। সাধারণ শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার ৭৯.৯ শতাংশ এবং ধর্মীয় শিক্ষায় অংশগ্রহণ ১৩.৫ শতাংশ।উপজেলায় একাধিক কলেজ, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার প্রতি স্থানীয় জনগণের আগ্রহ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিস্তার এ অগ্রগতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
প্রবাসী আয় অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি
রামগঞ্জের অর্থনীতি মূলত কৃষি, ব্যবসা, চাকরি এবং প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কর্মরত বিপুল সংখ্যক প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্স স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে।জেলার মোট প্রবাসীদের মধ্যে প্রায় ২২.৫৮ শতাংশ রামগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা। সংখ্যার হিসাবে প্রায় ২৭ হাজার ৪৬৯ জন প্রবাসী এ উপজেলার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। প্রবাসী আয়ের কারণে আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে।
প্রযুক্তি ব্যবহারে অগ্রগামী
ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও রামগঞ্জ জেলার মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর ৭৪.৪১ শতাংশ নিজস্ব মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। একই সঙ্গে ৫০.১৯ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, যা জেলার সর্বোচ্চ হার।মোবাইল ব্যাংকিং সেবাও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। উপজেলার প্রায় ৪২.৯০ শতাংশ মানুষ মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে লেনদেন করেন। ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এ হার গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করেছে।
উন্নত জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি
জীবনযাত্রার বিভিন্ন সূচকেও রামগঞ্জ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। উপজেলার ৯৯.৭১ শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় রয়েছে। স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে ৯৯.২৮ শতাংশ পরিবার।আবাসন খাতে জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাকা ঘর রয়েছে রামগঞ্জে। মোট বাসগৃহের প্রায় ৩০.৫৯ শতাংশ পাকা। এছাড়া ৯৪.৬২ শতাংশ মানুষ খাবার পানি ও গৃহস্থালি কাজে গভীর অথবা অগভীর নলকূপের পানি ব্যবহার করেন।
সম্ভাবনার উপজেলা
শিক্ষা, প্রযুক্তি ব্যবহার, প্রবাসী আয়, বিদ্যুৎ সুবিধা এবং উন্নত আবাসনের মতো সূচকে রামগঞ্জ উপজেলা লক্ষ্মীপুর জেলার উন্নয়নের একটি সফল মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। উচ্চ সাক্ষরতার হার, তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার এবং প্রবাসীদের অবদানে উপজেলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে।স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্প বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে রামগঞ্জ ভবিষ্যতে বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের অন্যতম অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।



0Share